আঠারতম সপ্তাহে আপনি এখন প্রায় সাড়ে চার মাসের গর্ভবতী। এ সপ্তাহেই হয়ত আপনি প্রথমবার আপনার বাবুর নড়াচড়া টের পাবেন, যদি না আগেই অনুভব করে থাকেন। প্রতি সপ্তাহে আপনি নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনো আনন্দ, কখনো মন খারাপ লাগা, আবার কখনো উত্তেজনা, উদ্বিগ্নতা আপনাকে ছেয়ে ফেলছে। কখনো বা সব কিছু একসাথে হচ্ছে! গর্ভকালীন সময়টা যেন এক আবেগের রোলারকোস্টার!

এবার আসুন দেখি এ সপ্তাহে …

আপনার শারীরিক পরিবর্তন

কিছু বিষয়ে এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে যেমন চিত হয়ে শোয়ার পরিবর্তে এখন থেকে আপনি কাত হয়ে শোয়ার প্রতি বেশি মনোযোগী হবেন। এর কারণ হচ্ছে, আপনার বাবু এখন বড় হচ্ছে ফলে আপনার তলপেটের পেছন দিকে যে বড় শিরা আছে তার ওপর চাপ প্রয়োগ বাড়ছে। ফলে আপনার হৃদপিণ্ডে রক্ত প্রবাহ কম হতে পারে। এটা আপনার রক্তচাপকে কমিয়ে দিতেও পারে। শুনে ঘাবড়ে যাবেন না, আপনি এ থেকে সহজেই মুক্তি পেতে পারেন কাত হয়ে শোয়ার মাধ্যমে।

এমন নানা অস্বস্তির কারণে রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানো হয়ত কঠিন হয়ে পড়বে আপনার জন্য। আপনি আরও যে বিষয়গুলো লক্ষ্য করবেন তা হচ্ছে:

কোমর ব্যথা

জরায়ু বড় হওয়ার সাথে সাথে আপনার শরীরের ভর কেন্দ্র পরিবর্তন হচ্ছে। সেই সাথে গর্ভকালীন হরমোন রিল্যাক্সিন নিঃসৃত হচ্ছে, যা আপনার লিগামেন্টগুলো ও হাড়ের জোরকে প্রসবের প্রস্তুতি হিসাবে শিথিল করতে সাহায্য করবে। এর মাঝে সেই লিগামেন্টও আছে যা আপনার পেলভিক হাড়কে শিরদাঁড়ার সাথে যুক্ত করে। এসব কিছুর ফলে আপনার কোমর ব্যথা হয়।

বসে থাকার সময় আপনার পা সামান্য উপরে তুলে পায়ের পাতাকে বিশ্রাম দিন। দাঁড়িয়ে থাকার সময় সম্ভব হলে এক পা নিচু কোন টুলে রেখে কোমরে চাপ কম দিতে চেষ্টা করতে পারেন। উষ্ণ পানিতে গোসল করেও আরাম পাওয়া যায়। কোমর ব্যথার জন্য ব্যয়াম দেখতে পারেন গর্ভকালীন ব্যয়াম নিয়ে লেখায়। এটা গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথার জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক ও সেই সাথে শরীরকে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য তৈরি করে

বুকজ্বলা

সুসিদ্ধ খাবার খান, ধীরে ভালমতো চিবিয়ে খান। এতে হজমে সুবিধা হয়। একবারে বেশি খাবার না খেয়ে দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে খান। খাওয়ার পরই শুতে না গিয়ে ঘন্টাখানেক সোজা বসে থাকতে চেষ্টা করুন এবং ঘুমের সময়ও মাথা কিছুটা উপরে তুলে শোবেন। যেসব খাবারে বুকজ্বলা হতে পারে বলে জানেন সেগুলো এড়িয়ে চলুন।

পা কামড়ানো বা লেগ ক্র্যাম্প

রাতে ঘন ঘন বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ার পাশাপাশি হঠাত ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে তীব্র পা কামড়ানোর কারণে। এটা একটা সংকেত হতে পারে যে আপনার ক্যালশিয়াম গ্রহণ কম হচ্ছে। লক্ষ্য করুন গর্ভকালীন প্রয়োজনীয় ১২০০ গ্রাম ক্যালশিয়াম আপনি প্রতিদিন খাচ্ছেন কি না। যদি আপনি পানি কম খেয়ে থাকেন তাহলে খেয়াল করে দৈনিক ৮ গ্লাস পানি পান করুন কারন এটা পানিস্বল্পতার লক্ষ্মণও হতে পারে।  

পায়ের পাতা ও গোড়ালি ফোলা – এডেমা

আপনার শরীরের টিস্যুগুলো এখন বাড়তি তরল ধারণ করবে আর তাই আপনাকে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে যা উপরে বলেছি। এ থেকে আপনার পায়ের পাতা ও গোড়ালির ফোলাভাব দেখতে পারেন। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ফলে তরল সেখানে এসে জমা হয়। এই সমস্যা এড়াতে দীর্ঘ সময় একভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন। যখনই সম্ভব হবে পা উপরে তুলে বসতে বা শুতে চেষ্টা করুন। একইরকম ফোলাভাব দেখতে পারেন আপনার হাতেও। হালকা কিছু হাতের ব্যয়াম করতে পারেন এ থেকে স্বস্তি পেতে।

তবে এমন ফোলাভাব নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই যতক্ষণ না এটা আপনি হঠাত ও তীব্র আকারে দেখছেন। এমনটা হলে, তৎক্ষণাৎ আপনার ডাক্তারের শরণাপন্ন হন কারণ এটি গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ সঠিক সময়ে যার চিকিৎসা না করালে এর থেকে প্রি-একলাম্পসিয়া ও খিঁচুনির মতো জীবননাশক জটিলতার জন্ম হতে পারে।

ভেরিকোস ভেইন

চামড়ার নিচে রক্তের যে দৃশ্যমান নীল শিরা দেখা যায় তা আপনার সার্কুলেটরি সিস্টেমে বাড়তি চাপের কারণে ফুলে যায়। এই সমস্যার সাথে মানিয়ে নিতে ঘন ঘন নিজের বসা, দাঁড়ানো বা শোয়ার ভঙ্গী পরিবর্তন করুন। যখনই সম্ভব হবে পা উপরে তুলে বসুন। পর্যাপ্ত ব্যয়াম করুন এবং আঁটসাঁট কাপড় ও জুতো পরা এড়িয়ে চলুন।

বাচ্চার বৃদ্ধি

আপনার বাবু এই সপ্তাহে একটা মিষ্টি আলুর সমান বড় এবং তার ছোট্ট হাতে একদম স্বতন্ত্র আঙ্গুলের ছাপ তৈরি হয়েছে! বাবুর দৈর্ঘ্য এখন প্রায় ৫.৫৯ ইঞ্চি ও ওজন প্রায় ৬.৭০ আউন্স।

আপনি ও আপনার স্বামী কি বাবুর সাথে কথা বলতে শুরু করেছেন? তার কানের হাড় ও নার্ভগুলো এখন কাজ করার মতো যথেষ্ট গঠিত হয়েছে এবং সে এখন সব ধরণের শব্দ শুনতে পায়। আপনাদের কথার পাশাপাশি আপনার পেটের ভেতরের শব্দ ও হৃদস্পন্দন পর্যন্তও! জানা গেছে, বাচ্চারা যে শব্দ পেটের ভেতর থাকতে শোনে জন্মানোর পর সেই শব্দে তারা বেশি সাড়া দেয়। একটা ছোট্ট পরীক্ষা করে দেখতে পারেন, প্রতিদিন তাকে শুনিয়ে কোন নির্দিষ্ট ছড়া বা দুয়া বলতে পারেন। দেখুন জন্মানোর পর সেটা শুনে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়।  

আপনি কি মনে করছেন পেটের ভেতর বসে আপনার বাবুটা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিচ্ছে? মোটেই না! সে খুবই ব্যস্ত আছে মাংসপেশি ব্যবহার করে সব ধরণের নড়াচড়া চর্চায়। আপনার বাবু হাই তুলছে, হেঁচকি উঠাচ্ছে, চুষছে, গিলছে – বিশ্বাস হচ্ছে? সে উলটাচ্ছে, মোচড় খাচ্ছে, লাথি-ঘুষিও দিচ্ছে। তার এসব নড়াচড়া এখন আপনার অনুভব করার মতো যথেষ্ট বড় ও শক্তিশালী হয়েছে। আপনার বাবুর নার্ভাস সিস্টেমও এখন দ্রুত পরিপক্ক হচ্ছে। পঞ্চইন্দ্রিয় গঠনে তার মস্তিষ্কের আরও গঠন হয়ে চলছে। 

আপনার পেটে যদি যময বাবু থাকে তাহলে একটা মেমব্রেন তাদের দুইজনকে আলাদা করে রাখে। এই সপ্তাহের আল্ট্রাসাউন্ডে আপনি সম্ভবত এটা দেখতে পাবেন।

১৮ থেকে ২২ সপ্তাহের মাঝে আছে মধ্য প্রেগন্যান্সী আল্ট্রাসাউন্ড যাকে এনাটমি স্ক্যান বা এনোমেলি স্ক্যানও বলা হয়। এতে আপনার বাবুর পুরো শরীর বিশদভাবে স্ক্যান করে দেখা হয় কোন জন্মগত সমস্যা আছে কি না যা গর্ভাবস্থায় বা প্রসবের পর ঠিক করতে হবে অথবা এমন কোন বড় জন্মগত ত্রুটি রয়েছে কি না যা জন্মের পর আপনার বাচ্চার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এই আল্ট্রাসাউন্ড বেশ কিছু বিষয় তুলে ধরতে পারে তবে সবকিছু পারে না। এই আল্ট্রাসাউন্ড করানো ঐচ্ছিক, আপনি চাইলে নাও করাতে পারেন। এতে যদিও বাচ্চা ছেলে না মেয়ে হবে সেটা সাধারণত জানা যায়, কিন্তু আপনার জানা থাকা ভালো যে এটা প্রকাশ করা বাংলাদেশে আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।

আপনার জন্য টিপস

মাথা ঘোরা মোকাবেলায় যা করবেন

হঠাত বসা থেকে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে উঠেছে? এর কারণ হচ্ছে গর্ভাবস্থায় প্রজেস্টেরন হরমোন বাবুর দিকে রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে দেয়, ফলে আপনার রক্তচাপ ও মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালন কমে যায়। এর কারণে আপনার সেই মাথা ঘোরা ভাবটা হয়। এ সমস্যা মোকাবেলায় শোয়া বা বসা অবস্থা থেকে দাঁড়ানোর সময় চেষ্টা করবেন ধীরে উঠতে।  

হেমোরয়েড মোকাবেলায় যা করবেন

গর্ভাবস্থায় হেমোরয়েড একটি সাধারন সমস্যা। মলদ্বারের স্থানে ভেরিকোস ভেইন ফুলে গিয়ে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পানি খান, খাদ্যতালিকায় আঁশযুক্ত খাবার রাখুন কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে ও বাথরুম করার সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। সমস্যা বেশি মনে হলে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ নিন কোন হেমোরয়েড ক্রিমের ব্যপারে।

রিল্যাক্সিন হরমোনের জন্য তৈরি হোন

এর উল্লেখ উপরে করা হয়েছে। দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে আপনার শরীর রিল্যাক্সিন হরমোন নিঃসরণ করবে। নামটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এই হরমোন পেশী, হাড়জোড় ও লিগামেন্টকে শিথিল করে তোলে যার ফলে আপনার পেলভিস ও নিতম্বে ব্যথা লাগতে পারে। এখন হয়ত বিষয়টা আপনার কাছে খুব অস্বস্তিকর লাগছে কিন্তু এটা মায়ের শরীরকে প্রসব উপযোগী করার জন্য স্রষ্টার এক নিখুঁত পরিকল্পনা। এর ফলে প্রসবের সময় বাচ্চাকে পেলভিসে জায়গা করে দেয়ার জন্য ও পেলভিস থেকে বের হওয়ার জন্য হাড়গুলো প্রশস্ত হয় যার কারণে প্রসব করা সহজ হয়।  

আয়রনের মাত্রা বাড়ান

গর্ভাবস্থায় রক্তের পরিমাণ বেড়ে যায়। এটা বাচ্চার জন্য যেমন প্রয়োজন, প্রসবের পর রক্তক্ষরণ হওয়ায় মায়ের জন্যও প্রয়োজন। তাই পর্যাপ্ত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেয়ে আপনাকে আয়রনের মাত্রা প্রয়োজন মাফিক রাখতে হবে। দৈনিক ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম প্রোটিন আপনার খাবারে যোগ হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চেয়ে প্রাণীজ প্রোটিন থেকে আয়রন বেশি শোষণ হয়। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের সাথে প্রোটিন গ্রহণ করলে আয়রনের শোষণ বেশি হয়। একইভাবে, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন যদি প্রাণীজ প্রোটিন ও ভিটামিন সি-এর সাথে গ্রহণ করা হয় তাহলে আয়রণ বেশি শোষণ হয়। অন্যদিকে, আয়রনের শোষণ কমে যায় যদি প্রোটিনের সাথে ক্যালশিয়াম, চা জাতীয় খাবার খাওয়া হয়। প্রাকৃতিক খাদ্য থেকেই যতটা সম্ভব আয়রন গ্রহন করা উচিত। তবে প্রয়োজনমতো ডাক্তার আপনাকে আয়রন ট্যাবলেট দিতে পারেন। দৈনিক কখন এই ট্যাবলেট গ্রহণ করলে আয়রন শোষণের মাত্রা সর্বোচ্চ বজায় রাখা যাবে তা জানতে পড়ুন আর্টিকেল প্রেগন্যান্সী ডায়েটের আদ্যপান্ত। 

নিচে কোন কোন খাবার থেকে আয়রন বেশি পাওয়া যাবে তার একটা ছবি দেয়া হলো।

পছন্দমতো ডাক্তার খোঁজ করুন

প্রসব নিয়ে আপনার পছন্দের সাথে ডাক্তারের অগ্রাধিকার মিলছে না? এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। গর্ভাবস্থায় নিজের পছন্দমাফিক ডাক্তারের খোঁজ করতে থাকুন, প্রয়োজনে কয়েকবার ডাক্তার পরিবর্তন করতেও ভয় পাবেন না। অন্য অভিজ্ঞ মায়েদের থেকে জেনে নিতে চেষ্টা করুন কোথায় আপনার পছন্দমাফিক ডাক্তার পাওয়া যেতে পারে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে প্রেগন্যান্সী গ্রুপগুলোকে ব্যবহার করুন এই কাজে। পাশাপাশি গর্ভাবস্থা নিয়ে বই, ওয়েবসাইট থেকে পড়াশোনা করে নিজের জানার পরিধি বাড়াতে থাকুন। অন্য মায়েদের প্রসব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানুন। প্রসবের দিনের জন্য প্রস্ততি হিসাবে দৈনিক গর্ভকালীন ব্যয়ামগুলো করতে থাকুন। 

স্বামীর সাথে সময় কাটান

শারীরিক ও মানসিক এত সব পরিবর্তনের মাঝে নিজেদের দাম্পত্য সম্পর্কে যেন ভাটা পড়ে না যায়। স্বামীর সাথে নিজের অস্বস্তি-অসুবিধাগুলো শেয়ার করুন, উনাকে বুঝতে দিন। কিসে আপনার কিছুটা স্বস্তি হতে পারে উনাকে জানান। উনি কোন সহযোগিতার হাত বাড়ালে তা সাদরে গ্রহণ করুন ও ধন্যবাদ দিন। প্রয়োজনে আপনি নিজেই উনার সহযোগিতা চান। এতসব অস্বস্তির ভীড়ে কিছুক্ষণ ভালো সময় কাটানোর জন্য দুজন একসাথে কোথাও ঘুরতে যান, অন্তত বাইরে কোথাও থেকে খেয়ে আসুন। 

তথ্যসূত্রঃ

১। What to expect.

২। Start 4 life

৩। the BUMP

৪। Parents

৫। GLOWM

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন
এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)
কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।

ছবি কৃতজ্ঞতা: Mother & Baby, Pinterest, Pngtree