শুরুতে বলতে চাই এক এক জনের প্রেগন্যান্সি এক এক রকম। তাই কেউ অন্যের প্রেগ্ন্যাসির সাথে নিজের তুলনা করে আপসেট হবেননা কখনো। যারা মা হতে যাচ্ছেন কিংবা প্ল্যান করছেন তাদেরকে ইন্সপায়ার্ড করা এবং ডেলিভারির জার্নিটা শেয়ার করার জন্য এই লেখা। হয়তো অনেকের সামান্য হলেও উপকারে আসবে ইন শা আল্লাহ।

ছোট করে প্রেগন্যান্সি জার্নিটা শেয়ার করি। প্রায় দেড়মাসের সময় জানতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট। প্রথম মাসের শুরুর দিকে বান্দরবানের একটা ট্রিপে ছিলাম।পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছি, চা বাগানে উঠানামা করেছি(যেহেতু জানতাম না!) কিন্তু আল্লাহ যাকে দুনিয়াতে আনার তাকে কে আটকাবে !আলহামদুলিল্লাহ!

প্রথম দুমাস একটু মাথা ঘুরানো, প্রেশার হাই হওয়া, বমি বমি ভাব, দাঁড়ায় কাজ করলে পা-পায়ের মুড়ি ব্যাথা করা এসব ছিল। পরের মাসগুলোতে মর্নিং সিকনেস কখনো ফিল করিনি আলহামদুলিল্লাহ। তবে প্রথম আর মাঝের দিকে এসিডিটির কারনে সকালে তিতা বমি হত।

১৯ সপ্তাহ থেকে আস্তে আস্তে বাবুর নড়াচড়া টের পাওয়া শুরু করেছিলাম যেটা আস্তে আস্তে বেড়েছিল। ডেলিভারির আগ পর্যন্ত আমি বেশ ভালোই বুঝতাম মুভমেন্ট। ৪ মাস থেকেই প্র্যাগনেন্সি/ডেলিভারি নিয়ে পড়াশুনা করা শুরু করি। কিছু ডাক্তার বোন, বান্ধবি, বড় আপু, এক্সপেরিয়েন্সড মমদের অনবরত প্রশ্ন করে করে মনের জিজ্ঞাসাগুলো জানতাম। কখনো বিরক্ত হননি উনারা। এটাও একটা বড় সাপোর্ট। ছোট খাট সব অজানা বিষয় নিয়ে গুগল করতাম, ভিডিও দেখতাম, আর্টিক্যাল পড়তাম। তাই হবু মাদের উদ্দেশ্য বলতে চাই প্র্যাগনেন্সি নিয়ে পড়বেন, জানবেন, জিজ্ঞেস করবেন। নিজেই আনন্দ পাবেন।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

২৫ সপ্তাহের আল্ট্রাতে বাবুর পজিশন সেফালিক আসে এবং বাকি বিষয় গুলো সব ঠিক আছে বলে জানান আমার সনোগ্রাফিস্ট। এবার আমি নরমাল ডেলিভারির জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিতে শুরু করি মানসিক ভাবে। আমার আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ছিল অনেক। রমজান মাসের রোজা, প্রতিটা নামাজে, মোনাজাতে আল্লাহর কাছে চেয়েছি একটা সুস্থ সম্পূর্ণ নেককার সন্তান এবং প্রাকৃতিক ভাবে যেন বাচ্চাকে দুনিয়ায় আনতে পারি তার জন্য শারীরিক সক্ষমতার জন্য ও দুআ করেছি।

অন্যদের মত খুব একটা হাঁটাহাঁটি তখনই করিনি(এ ব্যাপারে আলসেমি করেছি বটে!) তবে ঘরের দৈনন্দিন কাজ মিস দিইনি। শ্বশুরবাসার মেহমান, রান্নাবাটি, ঘরের কাজ, দাঁড়ায় করা যায় যে কাজগুলো(নিচু হয়ে কাজগুলো আর ভারি কাজ বাদ দিয়ে) সব চালিয়ে যেতে পেরেছিলাম আলহামদুলিল্লাহ।

৩৩ সপ্তাহে এসে আমি আমার প্রিনাটাল এক্সারসাইজ, কেজাল এক্সারসাইজ বা পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ, স্কোয়াট এবং নরমাল ডেলিভারির জন্যে উপকারী এক্সারসাইজগুলো শুরু করি। ব্যায়ামগুলো করতে করতে অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছিল (প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হত, মাসল পুল করতো) যার কারনে ডেলিভারির দিন পর্যন্ত কন্টিনিউ করতে পেরেছিলাম। সব স্টেপ সবসময় করতে পারতাম তা না! মাঝে মধ্যে স্কিপ করতাম তবে মিস না দেয়ার চেষ্টা করতাম। যতটা সম্ভব নামাজ দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি। খারাপ লাগলে বসে পড়তাম।

৩৬ সপ্তাহে এসে আমি হাঁটাহাঁটি শুরু করি নিয়ম করে। আমি বুঝতে পারি বাচ্চা নিচের দিকে নামছে, পেটটা দেখেই বুঝতাম। শেষের সপ্তাহে দিনে একবার করে সিঁড়ি ওঠানামা করতাম ৩/৪ রাউন্ড। এটা আপনার পেলভিক মাসলগুলাকে রেডি করতে সাহায্য করে। দিনে ৩-৪ লিটার পানি, ৪ টা করে খেজুর (বেশি খেতাম না, সুগার লেভেল নিয়ে ভয়ে থাকতাম তাই)। খেজুর সার্ভিক্স সফট করে। দিনে অন্তত একটা ডিম, একটা আনার (হিমোগ্লোবিন বাড়ায় এমন যেকোন ফল) খেতাম। আমার বেটার হাফকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন।

৩৯ সপ্তাহ চলে আসলো কিন্তু কোন পেইন বা পানি ভাঙার নাম নাই। অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। শরীরের অবস্থার জন্য কান্না চলে আসতো কারন মাথায় কাজ করতো কখন বাচ্চাটাকে বের করবো। আমি একটু শান্তিমত ঘুমাবো। শেষ চারমাস সারারাত জেগে থাকতাম, ঘুম আসতোনা। অসহ্য গরম পড়েছিল মে-জুনে। তখনো শান্তি পেতামনা।
যাইহোক USG edd ছিল ২৮ আগস্ট। আমি লাস্ট পিরিয়ড ডেইট বলতে পারিনি ওটাই ধরে প্রিপারেশন নিয়েছি। লাস্ট চেকআপে ডাক্তার বলেছে সব ঠিক আছে, যদি পেইন উঠে তাহলে তো চলে আসবা নতুবা ২৮ তারিখ ভর্তি হয়ে যাবা। কোন কিছুর সাইন দেখছিলাম না ( নিজেও অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম) তাই ১ দিন অপেক্ষা করে ২৯ তারিখ দুপুরে এডমিট হয়ে যাই।

ডেলিভারি জার্নি:

হালকা কোমরে ক্র্যাম্পিং নিয়ে দুুপুর ২ টায় এডমিট হই। ৩ টায় সেলাইন শুরু করে। লেবার রুমে খেজুর আর জমজমের পানি নিয়ে ঢুকেছিলাম। কিছুক্ষণ পরপর খাচ্ছিলাম। আধাঘন্টা পরই পিটোন দেয়। এর আগে পিভি চেক করে ১.৫ ছিল। ৫ টার দিকে আবার দেখে ২.৫। তেমন ব্যাথা শুরু হয়নি তখনো। লিকুউড খাবার খেতে বলে। মামীশাশুড়ি এসে বান আর চা খাওয়ান। আস্তে আস্তে পেইন আসছে। পুরো লেবার রুমে আমরা দুজন ছিলাম। ওই পেশেন্ট তখন এক্টিভ লেবারে ছিল, অসম্ভব চিলাচ্ছিল। তাকে দেখে একটু ভয় লাগা শুরু হচ্ছিল। তিনটা অসম্ভব ভালো নার্স পেয়েছিলাম পুরো সময় জুড়ে। সাহস দিচ্ছিল, অসুবিধা হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করছিল বারবার। ৭ টার দিকে ডাক্তার আসেন, পিভি চেক করেন এবং পানি ভেঙে দেন। পানি ভাঙ্গার আগে অন্য জুনিয়র ডাক্তারদের বলছিলেন, “সার্ভিক্স, পেলভিস খুব ভালো কিন্তু বাচ্চার মাথা একটু বড়…খেয়াল রাখো, রাতেই ডেলিভারির পসিবিলিটি আছে”।

মনে হচ্ছিল এক বড় কলসি গরম পানি বের হচ্ছে গড়গড় করে শরীর থেকে। পেটিকোট, চাদর ভিজে ফ্লোরে গড়িয়ে পরেছে পানি। এবার আমার রিয়েল পেইন শুরু হলো।

আমাকে একপাশ হয়ে বা সোজা শুয়ে থাকতে বলা হয়েছিল। তেমনই ছিলাম। মাথায় দুয়া যা আসছি পড়া শুরু করেছি। এভাবে করে করে রাত ৯ টায় আবার পিভি চেক করে পেছনে একটা ইনজেকশন দিল। নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম কী দিচ্ছে কিন্তু এখন ভুলে গেছি। এক্টিভ লেবার শুরু হচ্ছিল এবার। দাঁতমুখ খিঁচিয়ে আছি। কিন্তু ব্যথা বাড়ছে, এর যেন শেষ নাই! ব্যাথা আসে, ১ মিনিট কনট্রাকশন হয় এরপর ৪০ সেকেন্ড কেটে যায়। ওই ৪০ সেকেন্ড মনে হত ঘুমায় যেতাম, আরাম লাগতো। আবার ব্যাথা উঠতো… এভাবে করে করে কখন রাত ১২ টা বাজলো বুঝতেও পারিনি। পুরো লেবার রুমে আমি একা রোগী আর ৩ জন নার্স। এর মধ্যে ডাক্তাররা পিভি চেক করলো কয়েকবার। ১২ টায় চেকের সময় ডাক্তার বললো, “সার্ভিক্স ফুল ওপেন, ম্যমকে কল দেন। রোগী রেডি ডেলিভারির জন্য”। কথাটা শুনে এত ব্যথার মধ্যে কেমন যেন আনন্দ হচ্ছিল। ওইসময় মনে মনে বলছিলাম, ” এই তো আরেকটু ব্যথা, তারপরেই আমার বাচ্চা দুনিয়ায় আসবে। আমি পারবো ইন শা আল্লাহ! “

টেবিলে উঠানো হল ১২:৪০ এ। নার্স বলছিল, “হাগুর মত চাপ আসলে মুখ চেপে নিচের দিকে প্রেশার দিবেন। পুশ করবেন। কষা হাগু হলে আমরা যেমন করে টয়লেট বের করি তেমন..”

ডাক্তার সামনে থেকে বলছিলেন, পুশ কর। আমি একটা চিৎকার করছিলাম আর একটা পুশ দিচ্ছিলাম। তারপর আবার নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে যাচ্ছিলাম। ম্যম বলতেছিল,” রোগী তো ঘুম!”

৪/৫ বার পুশ করার পর বাবু আসলো আলহামদুলিল্লাহ। জোরে জোরে আলহামদুলিল্লাহ পড়ছিলাম অনবরত। সব কষ্টের যেন শেষ হল। তার কিছুক্ষণ পরই সেলাই পরলো, যেটা কম কষ্টের ছিলনা! পুশের চাইতেও চিৎকার বেশি করেছিলাম সম্ভবত। আল্লাহ এই কষ্টের ও শেষ করলেন আলহামদুলিল্লাহ। প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়ে প্রায় আধাঘন্টা পর বাবুকে দেখলাম। আমার ছোট সোনা বাচ্চাটা! যার জন্য এত অস্থির হয়ে ছিলাম ৪০ টা সপ্তাহ! অজান্তেই চোখের পানিটা টপ করে পড়লো।

আলহামদুলিল্লাহ নরমাল ডেলিভারির কারনে ১ রাত স্টে করে বাসায় ব্যাক করতে পেরেছিলাম।

সবশেষে হবু মাদের বলবো পজিটিভ কাউন্সেলিং আর সেল্ফ মোটিভেটেড থাকলে আর সর্বোপরি শারীরিক কন্ডিশন অনুকূলে থাকলে নরমালের জন্য এখনি প্রস্তুত হন!শুভকামনা আর ভালোবাসা সব মায়েদের জন্য ❤।

(লিখেছেনঃ উম্ম ইয়াহইয়া)

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা