কিভাবে নিশ্চিত হবেন যে আপনার সন্তান আপনার সাথে সবসময় সত্য কথা বলছে? এর জন্য কোন ১০০% সঠিক পথ নেই। বাচ্চাদের মিথ্যা বলা নিয়ে গবেষনা করছেন এমন গবেষকরা জানাচ্ছেন, মা-বাবার পক্ষে বাচ্চার মিথ্যা বলা ধরতে পারার প্রমাণ নেই।

বুঝা যাচ্ছে মা/বাবা হিসেবে সন্তান মিথ্যা বলছে কি না তা ধরার চেষ্টা করা বোকামি, সময় অপচয় ছাড়া কিছু না।

তাই ফ্যামেলি থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের কৌশলের কথা বলেন। তাদের মূলনীতি হলো: সত্য বলাটা বাচ্চাদের জন্য সহজ করে দিন।

সন্তান পালন বিষয়ে অভিজ্ঞ লেখক ও মনস্তত্ববিদ লরা মার্কহাম বলেন, “মিথ্যা বলার জন্য শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে আপনি বাচ্চাকে আরো পাকা মিথ্যাবাদীতে পরিণত হতে সাহায্য করছেন।” তাই সতর্ক হোন।

আদর্শ পদ্ধতি হলো, বাচ্চাকে তার শৈশব থেকেই সত্য বলতে শেখানো এবং তাকে বুঝিয়ে দেয়া যে সত্য বললে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি আপনি এটা না করে থাকেন, এবং আপনার বাচ্চা এরমাঝেই টীনেজ বয়সী (১৩ থেকে ১৯ বছর), তাহলে কি করবেন? ঠিক কাজ করার সঠিক সময় এখনই। তাই এই বয়সী সন্তানকেও যদি আপনি বুঝিয়ে দিতে পারেন যে সে সত্য বললে আপনি সেটা নিয়ে রেগে না যেয়ে তাকে সাহায্য করবেন, তাহলে হয়তো কাজ হতে পারে। তবে আপনাকে এই জন্য শুধু কথা না, কাজেও প্রমাণ দিতে হবে।

জো ব্রুম নামের একজন ফ্যামেলি থেরাপিস্ট বলেন, “সত্য বললে কোন সমস্যা হবে না, এটা বাচ্চাকে বুঝাতে আপনাকে কয়েক বছর ধরে টানা চেষ্টা করতে হবে। বাচ্চার মিথ্যা বলাকে আপনি কিভাবে দেখেন সেখান থেকেই বাচ্চা সিদ্ধান্ত নিবে সে আপনার সাথে কতটুকু সত্যবাদী হবে।

তাই এই লম্বা প্রক্রিয়া শুরু করুন, নিচের ধারাক্রম অনুসরন করতে পারেন:

১. বাচ্চার সাথে প্রতিদিনই সময় কাটান: এজন্য কোন বিশেষ কিছু করার দরকার নেই। হয়তো আপনার সারাদিন কেমন কাটলো সেটা তার সাথে শেয়ার করলেন, বা তার দিন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। অথবা তারসাথে একটু ভিডিও গেম খেললেন। কিংবা তার হাতের নখ কেটে দিলেন।

 

২. আপনার সন্তানের কাছে পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন: মার্কহাম জানাচ্ছেন, বাচ্চারা প্রথমেই আপনাকে বিশ্বাস করবে না। তারা হয়তো বলবে, তার বন্ধু করিম কোন একটি মন্দ কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। এরকম কথার উত্তরে আপনি যদি বলেন, “হায় আল্লাহ, করিমের বাবা-মা কি এটা জানে!”, তাহলে আপনার সন্তান কখনোই আপনার কাছে সত্যবাদী হবে না। বরং আপনার বলা উচিত, “আহা, করিম নিশ্চয় খুব মন খারাপ তাহলে! আচ্ছা, তোমার অন্য বন্ধুরা কি এমন কাজ করে?” এধরনের ফীডব্যাক তাকে আপনার কাছে মনখুলে কথা বলতে উৎসাহিত করবে।

৩. অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখানো: যখন আপনার সন্তান এমন কিছু বলে যেটা শুনে আপনার মাথা খারাপ হয়ে যায় বা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না এমন অনুভূতি হয়, তখন জোরে দম নিন এবং নিজেকে ঠান্ডা রাখুন।

দরকার পড়ে তো নিজের জিভ কামড়ে ধরুন যাতে এমন কোন কথা বের হয়ে না যায় যাতে আপনার সন্তান নিজেকে ছোট মনে না করে বা প্রচন্ড ভয় পেয়ে না যায়।

মার্কহাম বলেন, “যখন আপনার টীনেজ বাচ্চা আপনার উপর আস্থা রেখে মনখুলে কথা বলে, তখন আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রন আগের যেকোন সময়ের চেয়ে জরুরী।” এর মানে আবার এই না যে, আপনি তার কথা শুনেই সেটা মাথা থেকে বের করে দিবেন। বরং তার সাথে বিশ্বস্থ সম্পর্ক স্থাপনের ধাপে ধাপে তাকে বুঝিয়ে দিন আপনি মিথ্যা পছন্দ করেন না, এবং দুই জনের সম্পর্কের সততাকে আপনি সর্বোচ্চ মূল্য দেন।

৪. মাছ ধরা শেখান: যখন বাচ্চার সাথে আপনার আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সে মন খুলে তার বিভিন্ন ইস্যুর কথা আপনাকে বলছে, তখন তাকে “কি করা উচিত” টাইপের উপদেশ না দিয়ে বরং জিজ্ঞেস করুন, এটা নিয়ে সে কি ভাবছে, কিভাবে সমাধানের চিন্তা করছে। মাছ ধরে দেয়ার চেয়ে মাছ ধরা শেখানো সবসময়ই বেশি কার্যকরী।

ধরুন, আপনার সন্তান আপনাকে বললো, তার বন্ধুরা নিয়মিত সিরিঞ্জে করে কি যেন শরীরে পুশ করে। শুনেই হয়তো আপনার মাথা ঘুরে গেল। “কিন্তু এধরনের আবেগ নিয়ন্ত্রন করা জরুরী”, মার্কহাম জানাচ্ছেন। বরং এটা জিজ্ঞেস করুন, ” তোমার বন্ধুরা কি অসুস্থ? সিরিঞ্জ তো ডাক্তারদের দেয়ার কথা। …. আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়, ডাক্তারদের পরামর্শ ছাড়া সিরিঞ্জ নেয়া কি ঠিক?”

প্রত্যেক বাবা-মা চান তার সন্তান তার সাথে সত্যবাদী হোক, এবং মিথ্যা বললে তারা এমন শাস্তি বা বকা দিতে চান যাতে সেটার পুনরাবৃত্তি না হয়। কিন্তু বাস্তবে এমন কোন বকা/শাস্তি নেই যেটা সন্তানকে মিথ্যাবাদী হওয়া থেকে বিরত রাখবে। বরং সমাধান হলো বিশ্বাসের ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করা। এবং পিতামাতাকেই এই উদ্যোগ নিতে।

ছবিঃ Beenke