একজন আপু প্রশ্ন করেছিলেন যে উনার বাচ্চার বয়স দেড় বছরের কিছু কম, উনি কি এখন বাচ্চাকে বই পড়ে দেখাবেন নাকি আরও কিছু সময় অপেক্ষা করবেন? আরও জানালেন যে উনার কাছে কিছু শিশুতোষ বই আছে যেগুলো ইসলামিক বই না তাই উনি বুঝতে পারছেন না যে সেগুলো দেখানো ঠিক হবে কিনা। উনার প্রশ্নে মনের ভেতর অনেক কথা হুড়মুড়িয়ে এসে ভিড় করেছিল। অল্প কথায় উনাকে উত্তর দিয়েছিলাম। কিন্তু ভিড় করে আসা কথাগুলো লেখার ইচ্ছাটা তাতে চলে গেল না। তাই আজকে লিখতে বসলাম আমার বাচ্চাদের বইয়ের সাথে বড় করার গত চার বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে, আলহামদুলিল্লাহ্‌। প্রথমেই বলে নেই, এই লেখাটা আমার অভিজ্ঞতানির্ভর, কোন গবেষণা থেকে পাওয়া স্ট্যাটিস্টিক্স এতে নেই।

পশ্চিমা ধাঁচে গড়া দেশে আমার মেয়ে হয়। তৃতীয় দিন মেয়েকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে যখন বাসায় আসি তখন হাসপাতাল থেকেই মেয়েকে একটা শিশুতোষ বই দিয়েছিল। সেটাই আমার মেয়ের প্রথম বই। কোন খেলনা কিন্তু দেয়নি! সেইসব দেশে এক্কেবারে ছোট্ট বয়স থেকেই বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে উৎসাহ দেয়। সেই বইটাই মাঝে মাঝে খুলে উপরে তুলে মেয়েকে রঙ্গিন ছবিগুলো দেখাতাম।

ওর প্রায় দুই বছর পর্যন্ত আমরা নিজেরা কোন বই কিনিনি বলা যায়। তবে বেশ কিছু শিশুতোষ বই ও পেয়েছিল। সেগুলো হার্ডপেপারের ছিল, কাপড়েরও ছিল। ওর খেলনার সাথেই বইগুলো রাখতাম। খেলনা নিয়ে যেমন ও সময় কাটাত, বইগুলো নিয়েও অনেকটা সময় ও কাটাত। তবে সেই সময় বইয়ের ভেতর কী লেখা আছে সেটার প্রতি ওর আগ্রহ ছিল না, বরং রঙ্গিন ছবিগুলো দেখত ও, এবং অনেকক্ষণ ধরে দেখত। পরবর্তীতে আমার ছেলের সময়ও এটা দেখেছি। এক-দেড় বছরের বাচ্চারা খুব আগ্রহ আর মনোযোগ দিয়ে বইয়ের ছবি দেখে। বাসার বাইরে লেটার বক্সে ফ্রি প্রোডাক্ট ম্যাগাজিন দিয়ে যেত, সেগুলোও অনেক সময় দিতাম মেয়েকে দেখতে। মজার ব্যপার, ও সেগুলোও পাতা উল্টিয়ে দেখে যেত। এই বয়সটায় ওরা নিজেদের মতো করে জিজ্ঞেস করতে শেখে কোনটা কী। অনেকবার দেখতে দেখতে একসময় যদি জিজ্ঞেস করা হয় অমুক জিনিসটা কোনটা, নিজেরাই দেখাতে পারে।

দেশে আসার আগে সেকেন্ড হ্যান্ড বইয়ের দোকান থেকে কিছু বাচ্চাদের বই কিনেছিলাম। দেশে ফিরে মেয়েকে ব্যস্ত রাখার জন্য আরও বেশি বৈচিত্রময় বইয়ের দরকার হোল। আলহামদুলিল্লাহ্‌ বইয়ের দোকান বই বিচিত্রায় পেয়ে গেলাম সাধ্যের ভেতর খুব চমৎকার থিমের শিশুতোষ বই। কিছু বইয়ের ছবি দিলাম।

ট্রেনের বইটায় একটা ট্রেন কতরকম জায়গা দিয়ে যায় তার বর্ণনা আছে। আমার মনে হয়েছে বাচ্চারা না গিয়েও এসব জায়গা নিয়ে জানতে পারছে।

কচ্ছপের বইটায় একটা কচ্ছপের জীবনচক্র অল্প কথায় তুলে ধরেছে। ভিন্নধর্মী একটা বই মনে হয়েছে আমার এটাকে বাচ্চাদের জন্য।

সালাদ বানাতে পারার বইটা থেকে দেখে আমার মেয়েও বানিয়ে বানিয়ে ওর খেলনা প্লেট-চামচ দিয়ে সালাদ বানানো খেলত। এমন আরও বেশ কিছু বই আছে ওদের।

তবে এই কালেকশনগুলো একটু দেখে কিনেছি, ভুত বা জন্মদিন উদযাপনের মতো বইগুলো কিনিনি। পরে আবার বই বিচিত্রার ওই দোকানে গিয়ে দেখেছি এই বইয়ের কালেকশনগুলো সামনের দিক থেকে একদম পেছনের দিকে নিয়ে গেছে। একটু মন খারাপ হয়েছিল দেখে। মানুষ কী বেশি ছোট বাচ্চাদের জন্য বই কিনতে আগ্রহী না?

আরও বেশ কিছু বই আনিয়েছিলাম ওদের প্রবাসী বাবাকে দিয়ে। যেসব বই অনলাইনে ফ্রি শিপিঙের মাধ্যমে কেনা যায় সেসব দেখে অর্ডার করতাম। আরবী হরফের বই, টাচ এন্ড ফীল, লিটল হাইড এন্ড সীক বইগুলো সেভাবে কেনা।

টাচ এন্ড ফীল এক/দেড় বছরের বাচ্চাদের জন্য খুব মজার বই। আমার বাচ্চারা একটু বড় হয়েও মজা পেয়েছে। বাইরের দেশে টডলারদের জন্য উপযোগী সুন্দর বই পাওয়া যায় যেখানে একটা ছোট বাচ্চার জানার জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরির জিনিসের ছবিসহ নাম দেয়া থাকে, যেমন পরিবারের সদস্য, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ঘরের আসবাবপত্র, বিভিন্ন ফল, পশু, কাপড় ইত্যাদি। এসব বই দেশেও আছে, সেগুলোও দিয়েছি। তবে বাইরের হাইড এন্ড সীক জাতীয় কিছু বই আছে যেগুলো ইন্টার‍্যাক্টিভ বা হয়ত বৈচিত্র বেশি। বাচ্চাকে হয়ত খুঁজে বের করতে হয় কোন নির্দিষ্ট ছবি। এমন মজার বই দিয়েছিলাম দুইবার কিন্তু সাধারণ কাগজ হওয়ায় একবার মেয়ে আরেকবার ছেলে ছিঁড়ে ফেলেছে। হার্ডপেপারের হাইড এন্ড সীক বইটা আছে এখনো। এই ধরণের বইগুলো বাচ্চাকে অনেকটা সময় ব্যস্ত রাখে।

আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বাচ্চা খেলনা নিয়ে খুব বেশি সময় ব্যস্ত থাকে না। কিন্তু একটা বইয়ের ভেতর তার দেখার, মনোযোগ দেয়ার অনেক অনেক কিছু থাকে। একটা বই এত সহজে তাই তার কাছে পুরনো আর বোরিং হয় না। প্রতিবারই হয়ত সে নতুন কিছু খুঁজে পায় দেখার মতো। আবার একটু একটু করে বড় হওয়ার সাথে সাথে বইয়ের ভেতর কী আছে আরও ভালো করে বুঝতে শেখে। তাই বই এত সহজে তার কাছে পুরনো হয় না। অন্যদিকে, শুধু খেলনা নিয়ে বাচ্চা বেশিক্ষণ থাকে না, অল্প সময় পরই বোরড হয়ে যায়। তখন তাকে ব্যস্ত রাখার জন্য বাবা-মা সহজলভ্য মোবাইল আর টিভির দ্বারস্থ হন। এমনভাবে বেড়ে ওঠা বাচ্চাদের বই দিয়ে দেখেছি তারা বই অবজ্ঞার চোখে দেখে বা আগ্রহ পায় না অথবা আগ্রহ পেলেও সেটা যত্ন করে রাখে না।

মা হওয়ার চার বছর পর একটা জিনিস দেখে এখন খুব তৃপ্তি পাই যে, আলহামদুলিল্লাহ্‌ আলহামুদলিল্লাহ আমার বাচ্চারা খেলনা আর বই দুইটা আলাদা করে দেখে না। তারা খেলনা নিয়ে যেমন কৌতূহলী হয়, বই দেখতেও তেমন আগ্রহ পায়। একটা চার বছরের বাচ্চা মায়ের সঙ্গ ছাড়াও অনেকটা সময় শুধু বই নিয়ে কাটাতে পারে। আল্লাহর কাছে বারাকার দুয়া করি।

তাই বলতে পারি যে, একদম ছোট্ট বাচ্চাকেও বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়। সেটা শুধু ইসলামিক হতে হবে এমন না, একটা নতুন শিশুর কাছে সবই শেখার বিষয়। তাই বাচ্চার জন্য বেছে নেয়ার মতো বৈচিত্রময় বইয়ের সম্ভার আছে আমাদের সামনে। প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন।