প্রথমেই একটা ভিডিওর কথা মনে পড়ে, অনেক খুঁজেও এখন আর লিঙ্ক পেলাম না। একজন মিডওয়াইফের টক ছিল, কেনো গল্পে নাটক মুভি সবকিছুতে নরমাল ডেলিভারীকে এমন ভয়ঙ্কর ব্যাপার হিসাবে তুলে ধরা হয়? এটা ঠিক যে ব্যাথার ব্যাপারটা সত্য কিন্তু একটা মায়ের মধ্য দিতে একটা বেবী আসছে এই ব্যাপারটা কি অসম্ভব সুন্দর নয়?

তিনি নিজে একটা হোম ডেলিভারীতে ছিলেন, মহিলার ছেলে হবে, বড় মেয়ে পাশেই ছিল, মাকে বলছিল মা তোমার কষ্ট হচ্ছে? আমি তোমাকে হাগ দেব? মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ফাইন্যাল পুশে তার ছেলে হয়ে গেছিল, মিডওয়াইফ বলছিলেন এটা তার দেখা সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি।

আমার একটাই ছেলে, আলহামদুলিল্লাহ নরমাল ডেলিভারী। আমি ছোটবেলা থেকেই খুবই অলস, অকর্মণ্য এবং নাজুক ব্যাক্তি, শুভাকাঙ্খী (!!!) আত্নীয় স্বজনরা তাই সন্দেহ পোষন করতেন এরকম কঠিন সিচুয়েশন ফেস করতে আদৌ পারব কিনা। তাই অতি নাদান হিসাবে সবাইকে বলতে চাই, আমি পারলে আপনারাও পারবেন, আল্লাহ যদি আনুষাঙ্গিক সব ঠিক রাখেন।

তবে আমার প্রচুর হাটার অভ্যাস ছিল ছোটবেলা থেকেই, এখন যেটার জন্য কৃতজ্ঞ বোধ করি। কনসিভ করার পর থেকে যেকজন Doctor দেখিয়েছি বেশিরভাগই নেটিভ হোয়াইট, এরা সব সময় সাজেষ্ট করত হেলদী খাওয়ার পাশাপাশি যতোটা সম্ভব একটিভ আর হাটা চলার মাঝে থাকা যায়, থাকতে। যতটুকু শরীরে কুলায় পরিশ্রম ও করতে। না জানতে চাইলেও নিজে থেকে বলত সেক্সুয়ালী একটিভ থাকা নাকি ভালো। এইগুলার প্রতিটাই নরমালী আমাদের দেশে যা সাজেষ্ট করে তার উলটা, তাই বেশ অবাক হতাম।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

তবে প্রথম তিনমাস সিভিয়ার মর্নিং সিকনেসের জন্য হাঁটা দুরের কথা বেশিরভাগ বিছানাতেই পড়ে থাকতাম। তবে আলহামদুলিল্লাহ এর পর থেকে ডেলিভারীর দিন পর্যন্ত জীবনে যেরকম একটিভ থাকা দরকার, থেকেছি। স্বাভাবিক কাজের বাইরে দুইবার বাসা মুভ করা লেগেছে, একবার প্রভিন্স মুভ করতে হয়েছে, প্লেন জার্নি কার জার্নি সব ছিল। মোটামুটি লেভেল এর ওজনের স্বাভাবিক জিনিস তোলাও লেগেছে।

আলহামদুলিল্লাহ ভালোই ছিলাম, ২৮ সপ্তাহে বেবী বেশ ড্রপ করে গেছিল, কিন্তু সব ঠিক ছিল। ৩০ সপ্তাহের পর থেকেই হালকা হালকা স্পটিং দেখতে পাই। খুব ঘাবড়ে গেছিলাম, ভয় পাচ্ছিলাম আরলী লেবারের। কিন্তু ওই অবস্থায় ও ডাক্তার সাজেষ্ট করত হাটা চলা আর স্বাভাবিক কাজকরম চালিয়ে যেতে।

৩৭ সপ্তাহের ২য় দিনে হালকা ওয়াটার লীক শুরু হয়। ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানাই, কিন্তু উনি হালকা চেক শেষে বলেন না ওয়াটার লীক করছে না, উনি খুব তাড়াহুড়া করছেন এবং ভুল করেছিলেন। আমি জানতাম এটা পানি। ৩৮ সপ্তাহে হাসপাতাল চলে যাই, ওখানে ওরা ওয়াটার লীক বুঝে সাথে সাথে এডমিট করে নেয়।

তবে এক্ষেত্রে ডাক্তার দের মাঝে মনে হয় মতবিরোধ হয়, যেমন সেদিন এক ভাবিকে শুনলাম বলা হয়েছিল সিঙ্ক এর কল খুললে যেমন পানি পড়ে এমন না পড়লে নাকি হাসপাতালে আসা যাবে না। যাই হোক আমার পেইন ছিলনা, তাই প্রথমে সারভিটাল দিল, প্রচুর হাটাহাটি করতে বলল। ১২ ঘন্টা পরেও মাত্র ২ ফিঙ্গার খোলা পেল।

এরপরে পিটোসিন দেয়া হল। প্রথমবারের মতো সত্যিকার লেবার পেইন টের পেলাম, মনে হল ভিতরে ছুরি দিয়ে কাটা হচ্ছে, আসলেই তো তাই সারভিক্স খুলছে। একজন নার্স হেসে বলল, এখনই চীতকার করছ সোনা, এই ব্যাথা কিছুই না একটু পরে দেখবা কথাই বলতে পারবা না। সত্যি কিছুক্ষন পর যখন কনট্রাকশন আসছিল, কথা বলা দূরে থাক দম আটকে যাচ্ছিল। আমার কাছে ব্যাথার চেয়েও এই দম আটকে আসাটাই সবচেয়ে ভয়ের মনে হয়। তবে মাত্র ৩ ঘটার ৬ ফিঙ্গার খুলে গেল।

কোনদিন ভাবিনি এপিডুরাল চাইবো কিন্তু ঐ দম আটকে আসাটায় ভয় পেয়ে এপিডুরাল চাইলাম, দেয়ার লোক ছিলনা, ডাকাডাকি করতে আধা ঘন্টা চলে গেল। আসার পরেও কিছু জরুরী কথা সারতে অনেক সময় গেল, এখন ভাবি এইটুকুর জন্য না নিলেই পারতাম।

একসময় পুশ করার আরজ আসতে লাগল, প্রথম এক দুবার চীতকার দিচ্ছিলাম, ডাক্তার মহিলা বললেন, চীতকার করলে শক্তি খরচ হয়ে যাবে সোনা, মুখ এটে আরো জোরে পুশ দাও। তোমার বাচ্চার মাথা একদম নিচে এসে গেছে, এখন পুশ করেই তোমার বের করতে হবে আর কোন উপায় নাই সোনা।

কষ্ট হচ্ছিল, ক্লান্ত লাগছিল আর ১ ঘন্টা ১০ মিনিট লেগে গেছে এই ষ্টেজে। এত সময় লাগেনা খুব সম্ভব এপিডুরালের জন্য প্রগ্রেস স্লো হয়ে গেছিল। যাই হোক বেবী বের হয়ে গেল, আমাকে কোন এপিসিওটমী দেয়নি, তবে ন্যাচারালী ২য় ডিগ্রী টিয়ার হলো, সেটা সেলাই দেয়া হল। ভয় পাচ্ছিলাম যে ইন্ডিউসড লেবার তাই ব্রেষ্ট মিল্ক আসবে কিনা, আলহামদুলিল্লাহ জন্মের একঘন্টা পরেই প্রথম বারের মতো খাওয়াতে পারলাম।

[লিখেছেনঃ উম্ম মুস’আব]

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা