সম্পাদকের নোট: লেখক আরবীভাষী দেশে অবস্থান করছেন, এবং একারণে তাঁর জন্য আরবীতে কথা বলায় গুরুত্বারোপ করা স্বাভাবিক।

১.আরবী ০১

ওর সাথে বাসায় অন্তত প্রতিদিন দশ ঘন্টা সব কথাবার্তা আরবীতে বলা হয়। এছাড়া আরবীতে গল্প পড়ে শোনানো, শব্দভাণ্ডার বাড়ানো, বিভিন্ন সিচুয়েশন আরবীতে এক্সপ্লেইন করা এবং ওকে দিয়ে আরবীতে কথা বলানো (ওকে পুশ না করলে কমই আরবীতে কথা বলে).

যেমন, আকাশে পাখি উড়ছে। আমি ওকে আরবীতে জিজ্ঞেস করলাম, দেখ দেখ ঐটা কী? ؟انظري ما ذلك ধরা যাক ও উত্তর দিল যে هذا طائر. আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোন পাখি এটা? أي طائر هذا؟ ও দেখা গেল উত্তর জানে না। তখন বলে দিলাম যে এটা কাক পাখি, এটার রঙ কালো, গলার স্বর কর্কশ ইত্যাদি ইত্যাদি, সব আরবীতে। এর মধ্যে গলার স্বর কর্কশ এটা সে শুনেই হয়তো বুঝবে না, তাকিয়ে থাকবে। তখন কিছুটা অভিনয় করে(সেটাও আরবীতে) যতটুকু পারা যায় বুঝিয়ে দিব।

এরপর এমন কিছু জিজ্ঞেস করবো যেটা ও উত্তর জানে, কিন্তু আরবীতে বলতে পারে না/কষ্ট হয়। যেমন, কাকটা এখন কোথায়? উত্তরঃ আকাশে, আমাদের উপরে। কি করছে? উড়ছে/ গাছের ডালে বসেছে। ইত্যাদি। পুরো কথোপকথোন হবে আরবীতে। কোন বাংলা শব্দ আসবে না। এরকম সারাদিন এটা ওটা দেখিয়ে কথা বলি। বিভিন্ন কাজ করতে বলি আরবীতে। আমি যা করছি আরবীতে বুঝিয়ে বলি। আরবী গল্পের বই পড়ে শোনাই/বইয়ের ছবি আরবীতে ব্যাখ্যা করি। যেমন আরবীতে জিজ্ঞেস করি, এই ছবিতে লোকটা কী করছে? উত্তরঃ ঘুমাচ্ছে। কোথায় ঘুমাচ্ছে? মাটিতে। তুমি ঘুমাও তো? এরপর ও ঘুমের ভান করে শুয়ে পড়ে। আমি এটা করি অনেকদিন হলো। এরকম প্রায় এক মাস করার পর ওর এমন অবস্থা হয়েছে, আরবীতে মোটামোটি সব সহজ কথা শুনে বুঝতে পারে কিন্তু বলতে কষ্ট হয়/পারে না। এরপরেও আমি কন্টিনিউ করছি আলহামদুলিল্লাহ। ফীডব্যাক হলো, এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আরবী বলে( যদিও অনেক ভুল করে/শব্দ ভুলে যায়) আর শুনে আরো বেশি বুঝে আগের চেয়ে। 

তবে একটা ব্যপার খুব খেয়াল করে করার চেষ্টা করি, প্রায়ই মিস হয়ে যায়। সেটা হলো, আনন্দ, বিস্ময়, দুঃখ, রাগ ইত্যাদি সবকিছুই আরবীতে শেখানো। কারণ এটা আমার ভেতর থেকে বাংলাতেই আসে, আমিও বাংলা বলে ফেলি ভুলে। বিশেষ করে সিরিয়াস ধমক খুব কমই ওকে আরবীতে দেয়া হয়। 

প্রতিদিন একটা করে হরফ শেখাই। এরপর ঐ হরফ নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম। নেটে অঢেল আইডিয়া আছে। আমি যা যা করিঃ ঐ হরফ রঙ করা, ফোনেটিক্স প্রাক্টিস, অনেকগুলো হরফের মধ্যে থেকে ঐ হরফ খুঁজে বের করা, স্টিকার লাগানো, ফ্রিজে ম্যাগনেট বসানো(সোজা করে বসানো একটা চ্যালেঞ্জ), হরফ কেটে দেয়াল সাজানো, হরফ ট্রেসিং(একটা বড় কাগজে আমি লিখে শীট প্রটেক্টরের মধ্যে দিয়ে ওকে দিই। ও মার্কার দিয়ে সেটার উপর হাত ঘুরায় আবার মুছে ফেলে), লেটার ম্যাচিং ইত্যাদি।

হোমস্কুলিং আরবী ফ্ল্যাশকার্ড

একদিনে একটা হরফের বেশি শিখাই না, প্রতিদিন আগেরগুলো রিভিশন করাই ফ্ল্যাশকার্ড দিয়ে। ম্যাটেরিয়াল আমার নিজে বানানো। আমার এখানে যেগুলো পাওয়া যায় বাজারে কোনটাই আমার পছন্দ হয়নি। নিজে বানিয়ে নিয়েছি।

২. কুরআন

সুরাহ ফাতিহাহ এবং অন্য ছোট ছোট সুরাহ আমি খুব ধীরে তিলাওয়াত করি, ও আমার সাথে ঠোঁট নাড়িয়ে চেষ্টা করে মুখস্থ করতে। একটা সুরাহ একবারের বেশি সাধারণত পড়ি না, যাতে ওর বিরক্তি না আসে। কারণ মুখস্থ কোন বাচ্চাই পছন্দ করেনা। আলহামদুলিল্লাহ ওর এখন প্রতিদিন একবার পড়ে পড়ে বেশ কয়েকটা সুরাহ মুখস্থ হয়ে গেছে।

৩. তাজউয়ীদ

খুব একটা বাড়তি চেষ্টা করি  না। ও সুরাহ বলার সময় টুকটাক ঠিক করে দেই।

৪. কুরআনের শব্দার্থ

অসাধারণ একটা বই আছে এটার উপর বাচ্চাদের জন্য লেখা। ছবির বই। আমার বাচ্চার সবচেয়ে পছন্দের বই এটা। বেশ বড়, তারপরও তার একবারে বসে পুরো আমপারা শেষ করে উঠা চাইই চাই। ভোকাবুলারির ক্ষেত্রে রকেটের গতি পেয়েছি এটার মাধ্যমে আলহামদুলিল্লাহ। 

৫.অংক

বাংলা ইংলিশ আরবীতে দশ পর্যন্ত গুনতে শিখাই, সংখ্যা দেখে চেনা, ট্রেস করতে পারা। একই রঙের আটটা করে ছয় রঙের আটচল্লিশটা পপস্টিক দিয়ে বলি, হলুদ স্টিকগুলো আমাকে দাও। ও হলুদগুলো উঠায়(fine motor skill+color recognition), এরপর বলি গুনতে। ও একটা একটা মাটিতে রেখে গোনে(counting).

সব গোনাগুনি করাই বাংলায়। দীর্ঘমেয়াদে আমার ওকে  বাংলাতেই অংক শেখানোর ইচ্ছা ইন শা আল্লাহ। 

ও খুব মজার একটা কাজ খুব ভালোবাসে। সেটা হলো নামতা পড়া। আপাতত এক আর দুইয়েরটা পড়াই। ছোটবেলায় কত ছড়া পড়লাম, কোন কাজে আসলো না। নামতাগুলো ছড়ার মতোই শেখে, ইন শা আল্লাহ ভবিষ্যতে কাজে দেবে আশা করি।

এছাড়া করাই আকৃতি এবং রং চেনার পাযল(এগুলোও নিজে বানিয়ে নিয়েছি)।

৬. ছবি আঁকা

একসাথে ছবি আঁকি, যা খুশি তাই। মাঝে মাঝে দুই একটা টেকনিক শিখাই আঁকার। আমি সাথে থাকলে জলরং দেই, না থাকলে ক্রেয়ন। অরিগামি করি, স্টেপ ফলো করার চেষ্টা করে ও। যদিও কিছুই বানাতে পারে না, চেষ্টা যে করে আলহামদুলিল্লাহ এটাই বা কম কী?

৬. ইংলিশ

a b c d পড়াই, ঐ সময়ে ওর সাথে সব কথা ইংলিশে বলি। যদিও খুব কমই বোঝে।

৭. ইসলামিক আকীদা

শুধুমাত্র আল্লাহর পরিচয়, আল্লাহর রহমত, ভালোবাসা এগুলোই বোঝানোর চেষ্টা করি। তাওয়াক্কুল, দুয়া, এগুলোও শিখাই। যেমন সুন্দর একটা জামা পরালে বলি, মা শা আল্লাহ কী সুন্দর জামা। কে দিয়েছে এই জামাটা বলো তো? আল্লাহ দিয়েছেন। আল্লাহ তোমাকে কত্ত ভালোবাসেন দেখেছো? পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে শিখাই, আল্লাহ সব ঠিক করে দেবেন, আল্লাহকে বলো। এরকম টুকটাক।

আর বাসমালাহ, তাসবীহ দুয়া এগুলো শেখাই, কিন্তু এগুলোতে আসলে তেমন জোর দিই না। কারণ সাহাবী/তাবেঈদের মানহাজ এরকম ছিল না। উনারা আগে সন্তানের ঈমান তৈরীর দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতেন। অন্য কিছু শেখাতেন বয়স পাঁচ সাত হবার পর। এমনকি কুরআনও।

৮. বাইরে নেয়া

পার্কে নিই যত বেশি পারি। বিভিন্ন জায়গা যেমন এতিমখানা, হাসপাতাল, বস্তি ইত্যাদি পরিদর্শন করে রিপোর্ট বলানো (দুই-তিন লাইন বললেই আমি খুশি)। এতিম/গরীবকে নিজের প্রিয় বিস্কুট দান করা (নিজের জন্য আর এক পিসও থাকুক বা না থাকুক), এতিম বাচ্চাকে আদর করে দেয়া ইত্যাদি। ওদের কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা।

৯. ঘরের কাজ

এই বয়সী বাচ্চারা তো যা পারেনা তাও করতে চায়। আমি পিঁয়াজ কাটলে প্লাস্টিকের ছুরি দিয়ে ওকে কলা কাটতে দিই। ডিম ফাটতে দিই। রান্নায় মসলা দিতে দিই মাঝে মাঝে(যেটা একটু কম বেশি হলেও খেয়ে নেয়া যাবে)। কাপড় ধোয়া, শুকানো, ভাঁজ করা, ঘর গোছানো, যা পারা যায় সব করাই। (বিনা বেতনে হাস্যজ্জ্বল গৃহকর্মী হা হা)

১০. সামাজিকতা

আপাতত আশেপাশের বাসার বাচ্চাদের সাথে খেলাটাই ওর সামাজিকতা। মাঝে মাঝে পাশের বাসার আন্টির বাসায় খাবার দেওয়ার সময় আমার সাথে যেয়ে নিজের হাতে দেয়। আরেকটু বড় হওয়ার আগ পর্যন্ত এটুকুই শুধু। 

এছাড়া আদব শেখানো, সালাম দেওয়া, জাযাকাল্লাহ/জাযাকিল্লাহ বলা এগুলো তো টুকটাক আছেই।

লেখক: ফারিহা আমাতুর রহমান
সম্পাদনা: হাবিবা মুবাশ্বেরা