আপনি কি গর্ভবতী? কিছু লক্ষন বা উপসর্গের উপস্থিতির উপর ভিত্তি করে এটা নির্ণয় করা যেতে পারে। সাধারণত মাসিক/পিরিয়ড মিস হওয়ার ১ বা ২ সপ্তাহ মাঝে কিছু লক্ষণ দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে। এসব লক্ষণ প্রতি ১০ জনের ৭ জনের ক্ষেত্রেই গর্ভধারণের ৬ সপ্তাহ বা কমবেশি ৪৫ দিনের মাঝে দেখা যায়।

আপনি যদি মাসিকের হিসাব না রাখেন অথবা আপনার মাসিক যদি চক্র মেনে না চলে, তবে আপনি হয়তো বুঝতে পারবেন না কখন মাসিক হওয়া উচিত। এমন সময় আপনি হয়তো সময়মতো মাসিক না হবার কারণ নিয়ে চিন্তিত। তখন যদি আপনি নিচের কোন একটি উপসর্গ নিজের মাঝে দেখতে পান, তবে খুব সম্ভবত আপনি গর্ভবতী। নিশ্চিত হতে নিচের উপসর্গগুলো মিলিয়ে নিন এবং বাসায় বসেই একটা টেস্ট করে ফেলুন।

১০. খাবারে অনীহা:

গর্ভবস্থার শুরুর দিকে খাবারে অনীহা বোধ হওয়া বেশ স্বাভাবিক। যদি কোন খাদ্যদ্রব্যের (যেমন পেয়াজ) গন্ধ আপনার মাঝে বমি ভাব নিয়ে আসে তবে খেয়াল করুন এমনটা ক্রমাগত হচ্ছে কি না। এসময় বমি ভাব বা খাদ্যে অনীহার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে খুব সম্ভবত আপনার শরীরে ক্রমবর্ধমান ইস্ট্রোজেন হরমোনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটা। এসময় আপনার খুব পছন্দের কোন খাবার খেতে বিস্বাদ লাগলেও আশ্চর্য হবেন না। বরং এরকমই হয়ে থাকে!

০৯. মন মেজাজের উঠানামা:

এসময় মন মেজাজের কোন ঠিক ঠিকানা না থাকাই স্বাভাবিক। এমন মুড সুইংয়ের কারণ বেশ কয়েকটা। সম্ভবা মায়ের শরীরে এসময় হরমোন বদলের কারণে ব্রেনের অভ্যন্তরে মেসেজ বহনকারী নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমানে পরিবর্তন আসে। এই পরিবতৃন বিভিন্ন জনে বিভিন্নরকম হয়ে থাকে। সম্ভবা মা এসময় বেশ আবেগী অনুভব করেন, আবার অনেকে এসময় বিষন্নতা/দুশ্চিন্তায় ভোগেন।

০৮. পেট ফুলে যাওয়ার অনুভূতি:

হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে এসময় সন্তান সম্ভবা মায়ের পেট ফুলে যাওয়ার অনুভুতি হয়। এটা অনেকটা মাসিক হবার আগ মুহুর্তের অনুভুতি। এসময় আপনার এরকম মনে হতে পারে যে, পরিধেয় বস্ত্র কোমরের কাছে ছোট হয়ে গেছে, যদিও এখন পর্যন্ত আপনার জরায়ুতে তেমন কোন পরিবর্তন আসেনি।

০৭. ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ:

হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে এরসময় শরীরে যে ক’টি পরিবর্তন আসে তার একটি হল রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধি। রক্তপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বার বার প্রস্রাবের বেগ হয়। এই উপসর্গ আপনার প্রথম ট্রিমেস্টার বা ৬ সপ্তাহের মাথায় দেখা যাবে। এই অবস্থা বেশ কিছুদিন চলতে থাকবে। এবং আপনার শরীরে বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে এই সমস্যা আরও বাড়তে থাকবে।

০৬. অবসন্নবোধ:

মাঝেমাঝেই আচমকা ক্লান্ত বোধ করছেন? কিংবা ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়ছেন? আসলে কেউই এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পারেনি সন্তান সম্ভবা মা’র প্রথম দিকের ক্লান্তির কারণ কী। সম্ভবত প্রোজেস্ট্রেরন হরমোনের ক্রমবর্ধমান প্রবাহ আপনাকে এই ঘুম ঘুম অনুভুতি দিচ্ছে। এছাড়াও মর্নিং সিকনেস ও বার বার প্রস্রাব করাও আপনার ক্লান্তিবোধ বাড়াতে কাজ করছে।

তবে, ভাল খবর হচ্ছে, দ্বিতীয় ট্রিমেস্টার শুরুর সাথে সাথে আপনার এই ক্লান্তিবোধ কেটে গিয়ে আগের চেয়েও বেশি ভাল বোধ করবেন। অবশ্য আপনার গর্ভাবস্থার শেষ দিকে এই ক্লান্তিবোধ আবার ফিরে আসবে, কারণ তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনি অনেক বেশি ওজন বহন করবেন এবং সে সময়ের বিশেষ কিছু উপসর্গ আপনার রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে।

গর্ভধারণ করেছেন বা পরিকল্পনা করছেন? এই কোর্সটি আপনার জন্য।

০৫.  স্তন কোমল ও স্ফীত হওয়া

গর্ভধারণের পর শরীরে বিশেষ কিছু হরমোন প্রবাহের কারণে স্তনযুগল বেশ স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে, যা কি না গর্ভধারণের আরেকটি চিহ্ন। স্তনের এই ফুলে ওঠা এবং ব্যাথা অনেকটা মাসিক পূর্ববর্তী অবস্থায় ব্যাথার মত। তবে সুখের খবর, এই ব্যাথাযুক্ত অবস্থা প্রথম ট্রিমেস্টারেই শেষ হয়ে যাবে, কারণ এই সময়ের মাঝে আপনার শরীর এই পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়।

০৪. বমি বমি ভাব

সাধারণত গর্ভধাণের এক মাসের আগে বমি বমি ভাব দেখা দেয় না। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে যাদের গর্ভধারণের দুই  সপ্তাহের মাঝেই বমিভাব দেখা দেয়। সাধারণত সকালেই এই বমিভাব হয়, তবে অনেকের এই সমস্যা সময় মেনে চলে না। প্রায় অর্ধেকের মতো গর্ভবতী মহিলা তাদের দ্বিতীয় ট্রিমেস্টারের শুরুতে বমিভাব থেকে মুক্তি পায়, আর বাকিদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আর মাসখানেক দীর্ঘায়িত হতে পারে। তবে কখনোই এই বমিভাব একেবারে নিরাময় হয় না। খুব কম সংখ্যক ভাগ্যবতী মা এ থেকে মুক্তি পেয়ে থাকেন।

০৩. স্পটিং ও সাদা স্রাব

সহবাসের পর নিষিক্ত ডিম্বানু নিজেকে জরায়ুর দেয়ালে আটকে নেয়। এসময় স্পটিং (স্বল্প রক্তপাত) ও মাসিকের ব্যাথার মতো ব্যাথা হতে পারে এবং এগুলো গর্ভধারণের খুব প্রাথমিক সময়ের লক্ষণ। এধরনের স্পটিংকে Implantation bleeding বলে, যেটা গর্ভধারণের ৬ থেকে ১২ দিনের মাঝে হতে পারে।

এসময়ের ব্যাথার ধরণ মাসিকের ব্যাথার সাথে মিলে যাওয়ায় অনেক নারী এক মাসিক মনে করে ভুল করেন, সাথে স্পটিং তাদের ভুল ধারণাকে পোক্ত করে।তবে খুব শিঘ্রি তাদের ভুল ভাঙে, কারণ ব্যাথা বা রক্তপ্রবাহ খুবই স্বল্প পরিমাণে হয়ে থাকে।

এছাড়া মহিলারা এসময় সাদা স্রাব দেখতে পারেন। ডিম্বানু নিষিক্ত হওয়ার পরে যোনির অভ্যন্তরে পরিবর্তনের কারণে এটা হয়ে থাকে। এই স্রাব অনেকের ক্ষেত্রে পুরো গর্ভাবস্থায় চালু থাকে, এতে আতংকিত হবার কিছু  নেই। তবে যদি স্রাবের গন্ধ থাকে এবং জ্বালাপোড়া বা চুলকানির অনুভূতি হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া দরকার, যাতে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন কোন ইস্ট বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হয়নি।

০২. বর্ধিত শারীরিক তাপমাত্রা

যদি আপনি নিয়মিত আপনার শরীরের তাপমাত্রার চার্ট রেখে থাকেন, এবং যদি দেখেন একনাগাড়ে ১৮ দিনের বেশি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তবে খুব সম্ভবত আপনি গর্ভবতী।

আর সর্বশেষ…

০১. মাসিক মিস হওয়া

আপনার মাসিক যদি সঠিক চক্র মেনে চলে এবং ঠিক সময়ে যদি আপনার মাসিক না হয়, তবে উপরের উপসর্গগুলো দেখা না গেলেও আপনি বাসায় বসেই প্রেগনেন্সি টেস্ট করার কথা চিন্তা করতে পারেন। তবে আপনার মাসিক যদি অনিয়মিত হয়, এবং আপনি যদি এর ঠিকমতো হিসাব না রাখেন, তবে বমি ভাব, স্তনে ব্যাথা এবং বেশি বেশি বাথরুমে যাওয়ার দিকে খেয়াল করুন।

আমি কি গর্ভবতী?

আপনার মনে এই প্রশ্ন জাগার পর প্রথম কাজ হলো গর্ভবতী কি না তা পরীক্ষা করা। আপনার হাতের নাগালেই বেশ কয়েকটি উপায় আছে।

১. বাসায় প্রেগনেন্সি টেস্ট

এধরনের টেস্টকীট আপনি পাড়ার ফার্মেসিতেই পাবেন। এগুলো আপনার প্রস্রাবে প্রেগনেন্সি হরমোনের উপস্থিতি পরীক্ষা করে।

এই কিট ব্যবহারে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুনঃ

  • কিটের গায়ে লেখা নির্দেশনা ভালমতো অনুসরণ করুন।
  • মাসিক মিস হবার কমপক্ষে ১ সপ্তাহ পর পরীক্ষা করুন। 
  • আপনি যদি কোন ধরনের ঔষধ গ্রহন করেন বা আপনার শারীরিক অবস্থা কিটের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। তাই কিটের ফলকে চুড়ান্ত মনে না করাই শ্রেয়।
  • উপরে বর্ণিত লক্ষণ দেখা যাওয়ার পরও নেতিবাচক ফল এলে কয়েকদিনের ব্যবধানে আবারও টেস্ট করে আরো নিশ্চিত হোন
  • সর্বশেষে ইতিবাচক ফল পেলে ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি নিশ্চিত হোন।

২. রক্ত পরীক্ষা

রক্ত পরীক্ষা বেশ নির্ভরযোগ্য, এমনকি গর্ভধারণের বেশ প্রাথমিক সময়েও। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তার আপনার রক্তে Human Chorionic Gonadotrophin (HCG) হরমোনের উপস্থিতি দেখবেন

৩. প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ

মাসিক মিস হবার ২ সপ্তাহ পরে ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি আপনার জরায়ু ও গলদেশ (Cervix) পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। গর্ভধারণ করলে সার্ভিক্স নরম হয়, রং পরিবর্তন করে এবং জরায়ু বড় হতে থাকে। সরাসরি পরীক্ষার পরও ডাক্তার নিশ্চিত হতে রক্তপরীক্ষা দিয়ে থাকেন।

আপনি গর্ভবতী কি না তা নিশ্চিত হবার আগে থেকেই বাচ্চার গঠন শুরু হয় (যদি আপনি গর্ভধারণ করেন) এবং প্রাথমিক অবস্থায়ই আপনার নিজের যত্ন নেয়া জরুরী। তাই এব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র

১. ওয়েবএমডি
২. প্রেগনেন্সি, বার্থ এন্ড বেবি

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ সাবেরা সাঈদা খান
M.B.B.S (DU), MPH (Reproductive & Child Health)(NIPSOM),
Diploma in Ultrasonogram
Lecturer, Ibn Sina Medical College
Consultant Sonologist, Trust Medical Care