ছেলেটা পড়তে পারে না এখনো, কিন্তু প্রতি পাতার ছবি দেখে দেখে গল্পগুলো মনে করার চেষ্টা করে। এই ছেলেকে এক দুই লোকমা খাওয়ানোর জন্য কি ভয়াবহ কষ্টের সময় পার করতাম ছয় মাস বয়স থেকে, সুব’হানআল্লাহ! এক সময় মিউযিক ফ্রি ইসলামিক কারটুন দেয়া শুরু করলাম। ডিভাইস দেয়ার ব্যাপারটা হচ্ছে এটার সাথে এক্সপোনেনশিয়াল রেটে বাচ্চাদের জেদ বাড়তে থাকে, don’t ask me how. ও আরো দেখতে চাইতো, কান্নাকাটি করতো। আরেকটু বাড়িয়ে দিতাম হয়তো, আরামটা আমাদেরও গা সওয়া হয়ে গিয়েছিলো। সর্বক্ষন বাচ্চাকে এটেনশন না দিতে হওয়ার আরাম।

ইউসুফের একটা বিষয় আগে উল্লেখ করেছিলাম। ও কখনো একলা খেলতো না, কখনোই না। এরকম বাচ্চাকে সবসময় এনগেজ রাখতে হয় বাবা মা’কে নিজেদের সমস্ত, সমস্ত সময় বিসর্জন দিয়ে। ওর যখন দেড় বছর তখন খাদিজার জন্ম হয়।

একসময় দেখলাম ছেলেটা আরো বেশী, আরো বেশী স্ক্রিন টাইম চাচ্ছে, না দিলে জেদ কান্নাকাটির আশ্রয় নিচ্ছে। একদিন বাহিরে খেতে গেলাম, সে কিছুই মুখে নিচ্ছে না। তখন বাধ্য হয়ে মোবাইল বের করে এটা সেটা দেখায়ে খাওয়াতে হলো। সে মুহুর্তে বোধগম্য হলো এই ডিভাইস কী বিষাক্ত এক জিনিস।

বাদ দিয়ে দিলাম, একেবারেই। প্রচুর কষ্ট হতো, এক হাতে ছোটটাকে কোলে নিয়ে বড়টাকে খাওয়াতাম কারন খাদিজাও খুব কাঁদতো। আর বই থেকে একাধারে গল্প শুনাতাম। গল্প তো শুধু বলে যাওয়া না, অভিনয় করে দেখানো প্রতিটা ঘটনা। নাহলে কি আর মজা থাকে?

বইয়ের প্রতি ওদের ভালোবাসা হয়তো সেখান থেকেই। যেখানেই যাই, বইয়ের দোকান দেখলে ব্যাগের শেষ টাকা দিয়ে হলেও একটা বই কিনি। ওদের প্রতিটা বই অনেক যত্নে, ভালোবেসে কিনেছি।

সেদিন নায়াগ্রা ফলসে গেলাম। লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, জাহাজে উঠবো। লাইনে আরেক বাবা মা, বছর তিনেকের এক বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের মতন। বাচ্চাটা বেশ কাঁদছে। মা বাবা তখন বিরক্ত হয়ে হাতে মোবাইল রেখে একের পর এক কারটুন দেখাতে থাকলো। আবু ইউসুফ আর আমার এত মন খারাপ লাগলো এই দৃশ্য দেখে! একপাশে কি বিশাল জলরাশি, আর লাইনে দাঁড়ানো হরেক বাচ্চাকাচ্চা যারা হুটোপুটি করছে, কিন্তু বাচ্চাটাকে কোন কিছুই টানছে না। দেশে রেস্টুরেন্টেও অহরহ এমন দৃশ্য দেখি।

নিজেকে যেটা বারবার বলতাম,বুঝাতাম, সেটাই বলতে ইচ্ছা করে তাদের দেখলে, I know it’s hard, but this child did not ask to come in this world to you. But you did, you made a choice. বাচ্চাদের কিচ্ছু দরকার নাই, দামি খেলনা না, নিত্যনতুন কারটুন না। শুধু সময় আর সময়, আর আরেকটু সময়।

(লিখেছেন নাবিলা নোশিন সেঁজুতি। মূল লেখার নিচের কমেন্টগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন।)