আপনি চান বা না চান, দুশ্চিন্তা আপনার জীবনে আসবেই। মানুষ মাত্রই ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, অজানাকে নিয়ে আশংকায় ভোগে। কিন্তু সত্যি হচ্ছে দুশ্চিন্তা আপনার সমস্যার সমাধান করে দেবে না, আবার সমস্যাকে দূর করেও দেবে না। বরং মাঝখান থেকে আপনার মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং আপনাকে পূর্ণ মাত্রায় কর্মক্ষম থাকতে বাধা দেয়। আর তাই আমরা সকলেই চাই দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে, নিদেনপক্ষে একে সীমিত পরিমাণে রাখতে। আজকে আমরা জানব দুশ্চিন্তার সময় করণীয় কিছু কার্যকর ও আধ্যাত্মিক উপায় নিয়ে। 

যা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন সেটা লিখে ফেলুন 

মস্তিষ্ককে দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে এই পদ্ধতিটা অত্যন্ত মূল্যবান। যদি দুশ্চিন্তা আপনার রাতের ঘুমে ব্যঘাত ঘটায় তাহলে যা নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন সেটা লিখে ফেলুন। আপনি চাইলে টাইপ করতেও পারেন। যদি আগামী সপ্তাহের কোন দাওয়াত নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন তাহলে লিখে ফেলতে পারেন সেটা নিয়ে আপনার পরিকল্পনার খুঁটিনাটি। এতে করে আপনার মস্তিষ্ককে আর এত কিছু মনে রাখার জন্য শক্তি ক্ষয় করতে হবে না। ফলে আপনি মানসিক স্বস্তি পাবেন। অন্যভাবে বললে, আপনি মস্তিষ্ককে সচেতন করলেন সমস্যাটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে সেটার সমাধান বের করার জন্য। Anxiety, Stress and Coping জার্নালের বিজ্ঞানীরা এক পরীক্ষায় দেখিয়েছেন  যারা অবিরাম দুশ্চিন্তা করে তারা সমস্যার সমাধান বের করার চেয়ে হয়ত অনবরত সমস্যা এড়িয়ে চলে। তারা এক পরীক্ষায় কিছু দুশ্চিন্তাকারীদের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান লিখতে বলেছিলেন। এরপর সমাধানগুলোকে বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা দেখেছেন যারা একটা সমস্যা নিয়ে যত বেশি দুশ্চিন্তা করেছে তাদের সমাধানের মাঝে বাস্তবতার ছাপ তত কম প্রকাশ পেয়েছে।  

ব্যয়াম করুন

যদি একটা বাঘ আপনার দিকে ঝাঁপ দেয় তাহলে আপনি তৎক্ষণাৎ এড্রেনালাইনের তীব্র নিঃসরণ অনুভব করবেন। ভয় পাওয়ার পর আপনার মাঝে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় দুশ্চিন্তা করলেও সেই একই প্রতিক্রিয়া হয়, তবে আরও দীর্ঘ সময় ধরে এবং আরও অনেক কম মাত্রায়। 

সাইকোসোম্যাটিক মেডিসিন জার্নালের গবেষকেরা এক পরীক্ষায় বের করেছেন যে আপনার শরীরে যখন উদ্বেগের চিহ্ন থাকে তখন ব্যয়াম আপনাকে ভালো বোধ করতে সাহায্য করতে পারে। যদি আপনার শরীরে মানসিক চাপের চিহ্ন কম প্রতীয়মান হয় তাহলে আপনার মস্তিষ্ক ধরে নেবে যে দুশ্চিন্তা করার তেমন কিছু নেই কারণ শরীরে উত্তেজনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ব্যয়াম করলে হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যায় এবং ঘাম হয়। দুশ্চিন্তা করলেও এমনটা হতে পারে। দুশ্চিন্তা করলে রক্তচাপ কমে যায়, ব্যয়াম করলেও কমে। তাই ব্যয়াম মস্তিষ্কের কাছে এসব শারীরিক লক্ষণের আরেকটা কারণ তুলে ধরে। দুশ্চিন্তার সময় ৫ থেকে ১০ মিনিট হেঁটে আসুন। সম্ভব হলে বাইরে গিয়ে হাঁটুন আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করুন। 

দু’আ করুন

আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুশ্চিন্তার সময় আমাদের পড়ার জন্য দু’আ শিখিয়ে গেছেন। 

“হে আল্লাহ্‌! আমি আপনার বান্দা, আপনারই এক বান্দার পুত্র এবং আপনার এক বাঁদীর পুত্র। আমার কপাল (নিয়ন্ত্রণ) আপনার হাতে; আমার উপর আপনার নির্দেশ কার্যকর; আমার ব্যপারে আপনার ফয়সালা ন্যায়পূর্ণ। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি আপনার প্রতিটি নামের উসিলায়; যে নাম আপনি নিজের জন্য নিজে রেখেছেন অথবা আপনি আপনার কিতাবে নাযিল করেছেন অথবা আপনার সৃষ্টজীবের কাউকেও শিখিয়েছেন অথবা নিজ গায়েবী জ্ঞানে নিজের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন – আপনি কুরআনকে বানিয়ে দিন আমার হৃদয়ের প্রশান্তি, আমার বক্ষের জ্যোতি, আমার দুঃখের অপসারণকারী এবং দুশ্চিন্তা দূরকারী।” [আহমাদ, শাইখ আলবানী একে সহীহ বলেছেন]

এখানে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’আ করতে বলেছেন যেন কুরআন হয় আমাদের দুশ্চিন্তা দূরকারী। কিন্তু শুধু দু’আ করলেই সেটা হয়ে যাবে না। আমাদের কুরআন পড়তে হবে, অর্থ ও তাফসির পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই কুরআনে আমরা আমাদের জন্য স্বস্তিদানকারী এমন কথা খুঁজে পাব যা থেকে আমাদের দুশ্চিন্তা দূর হতে পারে।

আরেকটি দু’আ হচ্ছে,

“হে আল্লাহ্‌! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে।” [বুখারী]

এই দু’আর মাধ্যমে দুশ্চিন্তার সময় আমরা তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে পারি। ভালো সময়েও এই দু’আ পড়তে পারি যেন আল্লাহ্‌ দুশ্চিন্তা থেকে আমাদের দূরে রাখেন। 

তথ্যসূত্রঃ 

How To Train Your Brain To Stop Worrying

ছবিঃ Wikimedia Commons