বাচ্চাদের একজিমা

ছবি কৃতজ্ঞতা: শন

নবজাতকের নরম শরীরে শুকনো,লাল,ঘসঘসে ত্বক দেখে অনেক বাবা-মা’ই চোখ কপালে তুলেন। আর প্রথম বাচ্চা হলে তো কথাই নেই। দুঃশ্চিন্তার শেষ থাকে না বাবা-মায়ের। ত্বক এরকম অবস্থায় থাকলে, সম্ভবত আপনার বাচ্চা একজিমায় ভুগছে। একজিমা (Eczema) একধরনের চামড়ার অসুখ, যা খুব বেশী চামড়ার শুস্কতা থেকে হয়। কিছু বাচ্চার ত্বক এমনিতেই অন্য বাচ্চাদের তুলনায় বেশী সংবেদনশীল। কাজেই একজিমা হলেই দুঃশ্চিন্তার কারন নেই। কারণ ত্বকের এই অসুখ নিয়ন্ত্রন ও নিরাময়যোগ্য।

একজিমা কি?

সাধারনত দুই থেকে চার মাস বয়সের মধ্যে বাচ্চাদের একজিমা দেখা দিতে পারে। একজিমাতে দুই ধরনের অবস্থা হতে পারে, একটি এপোটিক ডার্মাটিটিস, যেটি সাধারনত পরিবারে অন্য কারো একজিমা, এজমা অথবা এলার্জি থেকে থাকলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আরেকটি অবস্থা কে বলা হয় কন্টাক্ট ডার্মাটিটিস, যেটি সাধারনতঃ স্কিন যদি নির্দিষ্ট কোন জিনিসের সংস্পর্শে আসে, যা কিনা এলার্জি তৈরী করে, তা থেকে একজিমা তৈরী করে। আবার উক্ত বস্তুটি সরিয়ে নিলে র‍্যাশ ভালো হয়ে যায়।

উপসর্গ

বাচ্চার শরীরের কিছু কিছু জায়গা ভীষন শুস্ক হয়ে লাল র‍্যাশের মতো বের হয়। এগুলো খুব চুলকায়। ছোট শিশু যেহেতু বলতে পারার মতো না, চুলকালি বা চুলকানি থেকে ঘা হয়ে গেলে বাচ্চা কান্নাকাটি করতে পারে। শরীরের যেকোন জায়গায় হতে পারে এই একজিমা। তবে গলার নীচের ভাঁজে, ঘাড়ে, পায়ের ভাঁজে, হাঁটুর পিছনে, কুঁচকিতে, কখনো ডায়াপার এরিয়াতে দেখা দিতে পারে।

একজিমা কেন হয়?

অনেক ক্ষেত্রেই একজিমা জন্মগত (Genetic)। পরিবারে বাবা বা মায়ের কারো একজিমা, এজমা বা এলার্জি থেকে থাকলে, বাচ্চার একজিমা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমাদের শরীরে সেরামাইডস নামে কিছু ফ্যাটি সেল থাকে। কারো শরীরে যদি এগুলো যথেষ্ট পরিমানে না থাকে, তাহলে স্কিন খুব সহজে পানিশূন্য শুস্ক হয়ে পড়ে। এতে একজিমার প্রাদুর্ভাব হয়। নির্দিষ্ট কিছু জিনিস যেমন ধূলাবালি, সাবান/ডিটারজেন্ট, খসখসে কাপড় এগুলা থেকে একজিমা ট্রিগার (Trigger) করতে পারে। আবার অন্য এলার্জি থেকেও একজিমা শুরু হতে পারে। যেমন কিছু বাচ্চার কিছু কিছু খাবারে এলার্জি থাকে, আবার কারো ধূলাবালিতে এলার্জি হয়।

করনীয়

একজিমা ছোঁয়াছে কোন অসুখ না। তবে একবার একজিমা হলে, তা বারবার হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। চুলকানোর কারনে বাচ্চা কষ্ট পায়। হাতের নাগালে থাকলে অনেকসময় নখ দিয়ে ঘা করে ফেলতে পারে। বাচ্চার একজিমা হলে যেসব হোম রেমিডি (Home Remedy) বাড়িতে বসে ট্রাই করতে পারেন-

  • ঠিলাঠালা সুতির নরম কাপড় পড়ান। খসখসে ও টাইট কাপড় পড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
  • বাচ্চার নখ কেটে ছোট রাখুন। খুব ছোট বাচ্চা ঘুমানোর সময় হাতে মিটন/গ্লাভস পরিয়ে রাখুন, যাতে নখ দিয়ে চুলকিয়ে স্কিনের ক্ষতি করতে না পারে।
  • ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। বাচ্চার স্কিন সবসময় ময়েশ্চার রাখুন। গোসল করানোর পর খুব বেশী সময় ময়েশ্চারিং করা ছাড়া রাখবেন না। এক্ষেত্রে গোসলের আগে ওলিভ ওয়েল দিয়ে ম্যাসাজ করাতে পারেন এবং পরে গন্ধবিহীন ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।
  • গোসলের সময় মাইল্ড সোপ বা বডি ওয়াশ ব্যবহার করুন, বড়দের সাবান এড়িয়ে চলুন। কারন বাচ্চাদের স্কিন বড়দের তুলনায় অনেক নাজুক থাকে।
  • উষ্ণ গরম পানিতে কম সময় গোসল করান,খুব বেশী সময় পানির সংস্পর্শে স্কিন দ্রুত শুস্ক হয়ে পড়ে।
  • বাসায় বা বাইরে, খুব গরম/ খুব ঠান্ডা তাপমাত্রা, যা স্কিনকে দ্রুত শুস্ক করে ফেলে এড়িয়ে চলুন।
  • বাচ্চাকে সবসময় হালকা কাপড় চোপড় পড়ান। প্রয়োজনের তুলনায় বেশী দুই-তিনটা কাপড় বা কাঁথা-কম্বল বাচ্চার উপর চাপিয়ে রাখবেন না। গরম থেকেও একজিমার সূত্রপাত হয়।
  • যেকোন নতুন পোশাক পড়ানোর আগে, ভালোমতো ধুয়ে শুকিয়ে নিন। কাপড়ের গায়ে এটাচ ট্যাগ লাগানো থাকলে, খুলে ফেলুন।

ওষুধ

ঘরোয়া উপায়ে যদি না কমে, ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। একজিমাতে ডাক্তার সচরাচর একধরনের স্টেরয়েড জাতীয় অয়েন্টমেন্ট- হাইড্রোকর্টিসন ক্রিম ব্যবহার করতে দেন। প্রতিদিন ২-৩ বার ব্যবহার করুন, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। তবে স্টেরয়েড দীর্ঘদিন স্কিনে ব্যবহার করা ঠিক না। এর দীর্ঘ ব্যবহার স্কিন পাতলা করে ফেলতে পারে। যেকারনে টানা ব্যবহার না করে, এক সপ্তাহ ব্যবহারের পর গ্যাপ দিয়ে, পরবর্তীতে আবার প্রয়োজনে ব্যবহার করুন। তবে সাধারনত দুই/তিনবার লাগালেই পার্থক্য চোখে পড়ে।

ব্রেষ্টফিডিং ও একজিমা

সাধারনত যেসব বাচ্চা ব্রেষ্টফিডিং করে তাদের একজিমা হওয়ার সম্ভাবনা ফরমুলা খাওয়া বাচ্চাদের তুলনায় কম থাকে। তারপরও স্কিন সংবেদশীল হলে যে কোন বাচ্চারই এটা হতে পারে। বাচ্চাকে যদি বুকের দুধ খাইয়ে থাকেন, তাহলে বুকের দুধ কিছুটা বের করে, একজিমার র‍্যাশের উপর লাগিয়ে রাখলে, এর তীব্রতা কমে আসে। মায়ের বুকের দুধের নিজস্ব কিছু প্রশমন ক্ষমতা আছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চার একজিমা একটু বড় হওয়ার পর নিজ থেকেই ভালো হয়ে যায়। আবার কারো ক্ষেত্রে ১৭/১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে অন্য যেকোন স্কিন ডিজিজের মতো, একটু সাবধান থাকলেই একজিমার অস্বস্তি থেকে বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন।

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ সাবেরা সাঈদা খান
M.B.B.S (DU), MPH (Reproductive & Child Health)(NIPSOM),
Diploma in Ultrasonogram
Lecturer, Ibn Sina Medical College
Consultant Sonologist, Trust Medical Care