আলহামদুলিল্লাহ্ অবশেষে আল্লাহপাক আমার এবং আমার ছেলের দুয়া কবুল করেছেন!

হ্যাঁ সঠিক সময়ের মাঝেই মায়ের দুধ ছাড়ার ব্যাপারে আমি সলাতে বসেও নিজে যেমন দুয়া করেছি ছেলেকে দিয়েও করিয়েছি যাতে আল্লাহ ওকে বুঝ দেন, সহজে মেনে নেয়ার ক্ষমতা দেন, কষ্ট কমিয়ে দেন।

একদিন দুইদিন না প্রায় বছর দুয়েকের অভ্যাস চাইলেই তো দুম করে আজীবনের জন্য ছাড়ানো যায় না, আর হঠাৎ করে ছাড়ানোও তো ঠিক না!

আমি চাইলেই কি আমার চায়ের অভ্যাস একনিমিশেই আজীবনের জন্য বন্ধ করতে পারবো!?

আমার নিয়ত ছিলো ছেলেকে ২ বছরের বেশি খাওয়াবো না ইনশা আল্লাহ। আর সেটাই হয়েছে কারণ আল্লাহ কবুল করেছেন বলে।

আর নিয়ত অনুযায়ী ৩ মাসের বেশি হাতে রেখেই ছেলেকে নানাভাবে কাউন্সেলিং করা; খাওয়ার হার কমানোর জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করা আর দুয়া করা শুরু করে দিয়েছিলাম।

আগেই বলে নেয়া ভালো যে আমার ছেলে সারাদিনে-রাতে, উঠতে-বসতে, দাঁড়িয়ে, এমনকি কোলে নিয়ে হাঁটছি, এমন অবস্থাতেও খেতো, ভাত মুখে নিয়েও পর্যন্ত খেতে চাইতো! পরিবারের মুরুব্বীরা এমন ছেলে আর দেখেনি নাকি! 🙂

 তাই খুব ভয়ে ছিলাম, এমন বুবু পাগল (আমার ছেলে দুধকে বুবু বলে) ছেলেকে কিভাবে ছাড়াবো? পারবো তো? অন্যদিকে আমার অসুস্থতার কারণে  অনেকগুলো ওষুধ খেতে হয়, রমাদানে রোজাও করবো, দুধ না পেলে তো ছেলে জেদও করবে 😔 ডাক্তারও অবশ্যই খুব দ্রুত ছাড়াতে বলেছেন।

**(২ বছরের মাঝে মায়ের বুকের দুধ ছাড়ার ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা আছে সম্ভবত, অথেনটিক সোর্স থেকে জেনে নিবেন প্লিজ।) 

যেহেতু আমার ব্যক্তিগত নিয়ত ছিলো ২ বছর, তাই আমি সেই অনুযায়ী চেষ্টা করেছিলাম। অন্যদিকে যতদূর জানি, সাইন্টিফিক মতে ২ বছর পূর্ণ হতে হতে মায়ের দুধে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানও ধীরে-ধীরে কমে যায়, এজন্য বাইরের খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে শিশুর প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে হয়। (ডাক্তাররা আরো ভালো বলতে পারবেন)।

তো, অনেক কিছু বুকে লাগিয়েছিলাম; যেমন নিমপাতা, করলার রস, কফিও লাগিয়েছিলাম কিন্তু কাজ হয়নি, হাত দিয়ে মুছে ফেলে ছেলে আমার দিব্যি খেয়েই যেতো। এদিকে ওকে খুশি রাখতে প্রায়ই বাসার বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতাম, বেশি মানুষের মাঝেও রাখার চেষ্টা করতাম।

যেদিন ২৩ মাস পূর্ণ হতে আর সপ্তাহ খানেক বাকি,

সকালে উঠে ছেলে খাচ্ছেই তো খাচ্ছেই, খাওয়ার জন্য প্রচন্ড জেদ আর সে কী কান্নাকাটি! সকালে ঘরের কোন কাজই করতে পারছিলাম না, উপায় না দেখে কি মনে করে দুম করে একটু ‘জেল টুথপেষ্ট’ (বড়দের, ছেলেরটা না) লাগালাম, ওমা কী কান্ড ওই যে ছেলে মুখ বাঁকিয়ে নিলো আর খেলো না তো, খেলোই না! আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো! আহারে ছেলেটা আর কখনো খাবেনা! 😔

তারপর ভাবলাম নাহ! আল্লাহ পাকের ইচ্ছে হয়তো এরকমই ছিলো, মনকে শক্ত করে ফেললাম, আর দিবোনা, কোনভাবেই না!

একবার সুযোগ দিলেই বুদ্ধিমান ছেলেটা ঠিক সুযোগের আশ্রয় নিবে, পরে ছাড়ানো আরো কঠিন না হয়ে যায়!

এদিকে আমার পরিবারের সবাইই আমাকে শক্ত হতে বললো। কিন্তু ছেলে কী আমার দুধ মুখে না দিলে ঘুমায়! (দুপুরের ঘুম আর রাতের ঘুম দিতে আমাকে এবং আমাদেরকে কী অপরিসীম কষ্ট ও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে ; এখনো হয়, সেগুলো বর্ণনা করলে লেখা আরো বড় হয়ে যাবে!) ছেলের হাত পা ছুঁড়ে আথালিপাথালি কান্নায় নিজেও কতো কেঁদেছি কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছি সব।

প্রথম রাতের তুলনায় দ্বিতীয় রাতে কিছু কম, তারপরের রাতে আরো কম, এভাবে ধীরেধীরে এখন আর কাঁদেই না আলহামদুলিল্লাহ, তবে এখনো মাঝে মাঝে পাগলামি করলে মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেই, বোঝানোর চেষ্টা করি, মাশাআল্লাহ তাতেই কাজ হয়।

ফিডার ধরানোর ইচ্ছে ছিলোনা, ছেলেও সেটা গ্রহণ করেনি আলহামদুলিল্লাহ, কাপে করে বা বাটিতে গরুর দুধ দিয়ে ভাত খাওয়াই আর সাথে দুধজাতীয় খাবার তো আছেই।

যারা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়াতে চাচ্ছেন তাদের জন্য আমার অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি জিনিস নিচে তুলে ধরছি:

  • প্রথমত নিয়ত ঠিক করতে হবে। আমি কবে থেকে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো ছাড়াতে চাই সেটা নিজের কাছে স্পষ্ট হতে হবে আগে। 
  • নিয়ত অনুযায়ী দুয়া করতে থাকতে হবে। আমি আসলে কী চাই, কীভাবে চাই, কখন চাই এক কথায় মনের সবকিছু আল্লাহকে বলতে থাকা। আল্লাহ এর কাছে অন্তর থেকে কেঁদে কেঁদে বাচ্চা এবং সবকিছুর জন্যে দুয়া করা। 
  • বাচ্চাকে কাউন্সেলিং করা ও একটু একটু খাওয়ার হার কমানো শুরু করা যেতে পারে ২/৩ মাস হাতে রেখেই।
  • বাধ্য না হলে বুকে কিছু না লাগানোই ভালো। (কিন্তু আমি বাধ্য ছিলাম ) আর একেকজনের বেলায় একেক জিনিস কাজে দিতে পারে! 
  • ফাইনাল মিশন আমি বৃহস্পতিবার সকালে  শুরু করেছি, এরপরে বন্ধের দিনে ছেলের বাবার সহযোগিতা পাওয়া সহজ ছিলো, সহযোগিতা পেয়েছিও আলহামদুলিল্লাহ্। তাই সম্ভব হলে কীভাবে বা কখন হাসবেন্ডের বা পরিবারের অন্য কারো সহযোগিতা পাওয়া যাবে সেটা মাথায় রাখা। 
  • ঐ কয়দিন ছেলের পছন্দের সব খাবার বাসায় মজুত রেখেছি। এটা আসলেই অনেক কাজে লাগবে ইনশা আল্লাহ।
  • রাতের বেলায় তার পছন্দের খাবার, খাওয়ার পানি বিছানার পাশেই রাখতাম।
  • পছন্দের জায়গাগুলোতে বেড়াতে নিয়ে যেতাম। 
  • সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে আমাকে ছাড়া কাছাকাছি ঘুরতে পাঠাতাম। 
  • উঠতে বসতে ছেলেকে ভালোবাসার কথা বলতাম এখনো বলি, প্রতিদিন তাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলি এবং তাকে দিয়েও বলাই যাতে ছেলে তার মায়ের উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে যে মা যাই করেন না কেন তার ভালোর জন্যই করেন। 🙂

হ্যাঁ এখনো এভাবেই চলছে, আর মাত্র ৩ দিন পরে ছেলেটার ২ বছর পূর্ণ হবে ইনশাআল্লাহ, এখনো মাঝেমধ্যে পাগলামি করে, কিন্তু তারপর প্রায় এক মাস থেকে আর খায়নি … 

সবাই আমার ছেলের জন্য দুয়া করবেন আর সবার জন্যও শুভকামনা এবং দুয়া থাকলো। 

(লিখেছেন উম্মে ফাইয়াদ)