analysis blackboard board bubble
Photo by Pixabay on Pexels.com

আমি সবসময় নিজেকে এবং আমার মত সকল মাকে আহ্বান করি বাচ্চার সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠা নিয়ে চিন্তা করার জন্য। বাচ্চার বেড়ে ওঠা নিয়ে কোন মা চিন্তা না করেন? ঘন্টার পর ঘন্টা খাওয়া নিয়ে, ঘুম নিয়ে যুদ্ধ হোক, বাচ্চাকে রোগ জীবাণু থেকে রক্ষার জন্য ঘর ঝাঁ চকচকে রাখাই হোক, সুষম পুষ্টিকর খাবার যোগান দিতে প্রতিদিন প্রোটিন, সবজির সুষম পরিকল্পনা আর রান্নাই হোক, বাচ্চার বেড়ে ওঠাকে ঘিরেই তো মায়েদের চিন্তা।

কিন্তু আমি যে চিন্তার কথা বলছি সেটা একটু আলাদা, অনেকখানি ঝুঁকিপূর্ণ। যাঁরা মনে করেন বাচ্চার পেটে ভালো ভালো খাবার যাওয়া আর হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা হওয়া তার সুস্থতার জন্য ভালো, তাঁরা তাই করছেন। অনেকে আবার বাচ্চার ভালোর চিন্তা করেই বাচ্চার খাওয়া তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যাতে করে সে খাওয়ার ব্যাপারে স্বাবলম্বী হয়। ফলস্বরূপ অনেকের বাচ্চাই আজকাল আর খাওয়া নিয়ে জ্বালায় না। জানে যে না খেয়ে থাকলে মা সাধবে না, ওকেই ক্ষুধা নিয়ে থাকতে হবে। এই আইডিয়াটা কোথা থেকে পেয়েছি আমরা? বেশিরভাগই হয় মা দাদীদের কাছে, অথবা হয়তো ফেসবুকে বা অন্য কোথাও অন্য কোন মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে পড়ে বা শুনে।

রোগ জীবাণু নিয়ে পড়াশোনা করা অনেকেই আজকাল বলেন, বাচ্চাকে কাঁদামাটির মধ্যে ছেড়ে দিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, ঘর বাড়ি পরিষ্কারে বেশি খুঁতখুঁত স্বভাব না থাকাই ভালো। আমাদের যাঁদের জীবাণুর ব্যাপারে অত পড়াশোনা নেই, তাঁরা কেউ কেউ মানতে পারিনা, কেউ আবার মেনে নেই। যে যেটাই করি না কেন, ধারণাটা অন্যের কাছ থেকে পাওয়া।

তবে যে দুটো উদাহরণ দিলাম, সেগুলোতে আমাদের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কিছুটা সহজ, কেননা এগুলো নিয়ে এক্সপার্টরা অনেক গবেষণা ইতোমধ্যেই করেছেন, মোটামুটি নিশ্চয়তা দিচ্ছেন তাঁদের উপসংহারে। কিন্তু অন্যান্য অনেক ব্যাপার আছে সন্তান প্রতিপালনে যেগুলোর ব্যাপারে সঠিক এপ্রোচ কী হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সামনে নেই। এই প্রসঙ্গগুলো উত্থাপিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী, এবং এগুলোর উত্তর যে যার মত করেই খুঁজে নেন, অথচ কেউই নিশ্চিত না যে তাঁর চিন্তাটা সঠিক কিনা।

এগুলোর মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় যে প্রশ্নগুলো, তার মধ্যে একটা হলো, বাচ্চার পড়াশোনা পদ্ধতি। আপনি খুঁজে খুঁজে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো স্কুলে বা মাদ্রাসায় সন্তানকে পাঠাতে পারেন, অথবা বাংলাদেশের বাইরে। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, বাচ্চাকে জীবন ও যুগের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে সবচেয়ে ভালো স্কুল(ইসলামিক বা সেক্যুলার) বা সবচেয়ে ভালো মাদ্রাসা(কওমী হোক বা আলিয়া) ব্যর্থ। আমরা কখনই ভাববো না, অমুক স্কুলে বা মাদ্রাসায় ভর্তি পরীক্ষায় পাশ করার আগ পর্যন্ত আমার কাজ, তার পর শুধু বাচ্চার পড়াশোনার খোঁজ রাখা, হোমওয়ার্কে সাহায্য করা, স্কুলের শিক্ষকদের পরামর্শ অনুসরণ করে চলা, বাসায় টিভি না রাখা ইত্যাদি সন্তানকে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট, আমাদের চিন্তার এবং মাথা ঘামানোর দিন শেষ।

প্রচলিত স্কুলিং পদ্ধতি এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কারিকুলামের সমালোচনা এবং ক্ষতিকর দিক নিয়ে আলোচনা করা শুরু করলে পনেরো-বিশ পর্বেও লিখে শেষ করা যাবে না। কাজেই এই প্রসঙ্গ পাশ কাটিয়েই মূল কথায় আসি। আমি মূলত এই লেখাটা লিখছি হোমস্কুলিং এর ব্যপারে মোটামুটি ইতিবাচক সিদ্ধান্তে চলে এসেছেন, এরকম মায়েদের জন্য। যাঁরা যে কারণেই হোক, স্কুল বা মাদ্রাসা দুটোর ব্যাপারেই হতাশ।

হোমস্কুলিং শুরু করার আগে আমাদের খুব ভালোভাবে নিজেদের কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার। যেমনঃ কেন আমি মাদ্রাসা বা স্কুল পছন্দ করি না। এই কেন’র উত্তর গুলো পয়েন্ট আকারে মাথায় সাজিয়ে প্রত্যেকটার ব্যাপারে আমি হোমস্কুলিং এ কী সমাধান নিয়ে আসতে যাচ্ছি, সমাধানটা কীভাবে করছি সেটার উত্তর নিজের কাছে স্পষ্ট হওয়া জরুরী। এবং এই কীভাবের উত্তরগুলোই আমার কাছে মনে হয়, সবচেয়ে বিতর্কিত ও চ্যালেঞ্জিং। যার জন্য মাথা ঘামানো হয়তো, আজীবনেও শেষ হবার না।

অগণিত সমস্যার মধ্যে আজকে শুধু একটা নিয়ে কথা বলবো। মাদ্রাসা বা স্কুলগুলোর কারিকুলাম অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভর্তিই শুধু না, যেটা আগে জানা দরকার, সেটা শেখাচ্ছে পরে, আর যেটা ছাড়া চলবেই না, সেটা শেখাচ্ছে অনেক পরে, অথবা শেখাচ্ছেই না। অনেক হোমস্কুলার একটা ধরাবাঁধা ভালো কারিকুলাম খুঁজে বের করে অন্ধভাবে অনুসরণ শুরু করেন। কিন্তু আমি আমার সাধ্যের মধ্যে অনেক জায়গার অনেক কারিকুলাম হাতড়ে দেখেছি, একটা কারিকুলামও উপযুক্ত মনে হওয়া দূরে থাক, এর ধারে কাছ দিয়েও আমি আমার বাচ্চাকে নেব বলে মনে হয়নি। সব বারই মনে হয়েছে এসব কিছুই একেবারে বাদ দিয়ে কারিকুলামের কন্সেপ্টকেই পারলে ঢেলে সাজাই।

কিন্তু এটা করার ঝুঁকি নিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে এক্সপার্টদের তিল তিল করে গড়ে তোলা বিশ্ববিখ্যাত কারিকুলামকে চ্যালেঞ্জ করে সম্পূর্ণ ভিন্ন এপ্রোচ গ্রহণের জন্য যে পড়াশোনা, যে পর্যায়ের চিন্তাভাবনার ক্ষমতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা দরকার, তা কি আমাদের পর্যাপ্ত আছে? না, আমরা কেউই এক্সপার্ট না, এক্সপার্ট হয়ে থাকলেও ভুলের ঊর্ধ্বে না। আমাদের গঠনমূলক চিন্তা ও পার্স্পরিক দীর্ঘ আলোচনায় চমৎকার একটা কারিকুলাম তৈরি হতে পারে যা এই যুগের সকল সীমাবদ্ধতায় ভরপুর কারিকুলামকে চ্যালেঞ্জ করবে। তার জন্য আমাদের পড়াশোনার মান উন্নয়নই যথেষ্ট না, পারষ্পরিক আলোচনায় “বাচ্চাকে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোন কোচিং এ দিসেন ভাবি” অথবা “এ বি সি ডি শেখানোর জন্য কোন ফ্ল্যাশকার্ড ভালো হবে” ” গুণতে শেখানোর কী কী আইডিয়া আছে” জাতীয় প্রশ্নের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে হবে।

কখনও কি আমাদের মনে প্রশ্ন আসে, আদৌ কেন আমরা তিন চার বছর বয়সের বাচ্চাদের অক্ষর আগে শেখাই, তারপর রিডিং পড়া, পাশাপাশি চলে গণিত, কুরয়ান হিফয, ইসলাম শিক্ষা ইত্যাদি? এর কি কোন ব্যাতিক্রম হতে পারতো? একশ’ জনে নিরানব্বই জনই বাচ্চাকে আগে অক্ষর শেখায়, তাই বলে কি এটা ভুল হতে পারে না? সঠিক এপ্রোচ কোনটা? নিরক্ষর আরবদের অসাধারণ মুখস্থ শক্তি ছিল, এ কে ফজলুল হকের মত একবার শুনে শুনে তারা শ’ খানেক কবিতা মুখস্থ করে ফেলতো। অক্ষর শেখানোর আগে কি অন্য কোন স্কিল নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন আছে? কী সেই স্কিল? কোন বিষয় আগে পড়ানো দরকার, আগে আরবি ভালোমত শিখে তারপর বুঝে বুঝে কুরয়ান হিফয, নাকি আগে না বুঝে হিফযটা করে নিয়ে তারপর অন্যান্য বিষয়, এরকম অগণিত প্রশ্ন মাথায় যতক্ষণ উঁকি না দেয়, ততক্ষণ সেগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আলোচনা, গঠনমূলক বিতর্ক, যেগুলোর সমাধানে আসা, এবং আমাদের হাত ধরে এই যুগের সব চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে একটা উপযুক্ত কারিকুলাম তৈরি হওয়া সম্ভব না।