স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও শরীর সুগঠিত করতে ব্যয়ামের উপকারিতার কথা আমরা সবাই জানি। মেয়েদের শিক্ষা জীবনে এর প্রতি আগ্রহ থাকলেও সংসার জীবনে ঢুকে যাওয়ার পর অনেকেরই আর এর পেছনে সময় দেয়া হয় না। আজকাল যদিও শহুরে শিক্ষিত মেয়েদের মাঝে গর্ভকালীন ব্যয়ামের গুরুত্ব বাড়ছে কিন্তু অনেকেই এই বিষয়ে সঠিকভাবে জানেন না। আবার সন্তান প্রতিপালনের সময়ও নিজের যত্নে ব্যয়ামের গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকে সচেতন না।

আজকে লিখব গর্ভকালীন কিছু ব্যয়াম নিয়ে ও মা হয়ে যাওয়ার পরও জীবনে ব্যয়ামের ভূমিকা নিয়ে। শুরু করছি গর্ভকালীন কিছু প্রচলিত কার্যকরী ব্যয়ামের কথা দিয়ে।

১। হাঁটা – গর্ভবতী মায়েদের প্রতিদিন কোন প্রকারের ব্যয়াম করা উচিত। শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তির উপস্থিতির জন্য ও শরীরকে কষ্টসহিষ্ণু করে তৈরি করার জন্য হাঁটা হচ্ছে বিশেষজ্ঞ নির্দেশিত ব্যয়াম। এটা করতেও অত্যন্ত সহজ। হাঁটা মায়ের পেলভিসকে উন্মুক্ত হতে ও প্রসবের জন্য বাচ্চাকে ভালো অবস্থান নিতে সাহায্য করে। প্রসবব্যথা চলাকালীন হাঁটলে প্রসব দ্রুত হয় এবং এই সময় কাছের মানুষদের উচিত মাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তার পক্ষে সম্ভব হাঁটতে উৎসাহিত করা।  

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

২। পেলভিক ফ্লোর (Pelvic Floor) বা কেজেল (Kegel) ব্যয়াম – এই ব্যয়ামকে সবগুলোর মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলা যেতে পারে এবং আজীবন এর চর্চা করলে উপকৃত হবেন। কারণটা, গর্ভাবস্থায় হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় বা জোরে হাসার সময় প্রায়ই প্রস্রাব বের হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সন্তান জন্ম দেয়ার পরও এমনটা হয়। এর কারণ গর্ভাবস্থায় ও সন্তান প্রসব করার পর এই পেশী শিথিল হয়ে যায়। তবে আপনাদের জন্য ভালো খবর হচ্ছে, এই পেশী বেশ দ্রুতই ব্যয়ামের প্রতি সাড়া দেয়। প্রথমে আপনাকে বুঝতে হবে এটা কোন পেশী। এগুলো হচ্ছে মেয়েদের পিউবিক হাড়ের নিচে স্ত্রীযোনি ও মলদ্বারের মাঝের টিস্যুগুলো। কিভাবে একে চিহ্নিত করবেন? টয়লেটে প্রস্রাব করতে গিয়ে প্রস্রাবের ধারা ইচ্ছাকৃতভাবে বন্ধ করে দেবেন। এভাবে থামিয়ে দিতে আপনি যে পেশীগুলো ব্যবহার করবেন সেগুলোই হচ্ছে পেলভিক ফ্লোর পেশী। তবে, পূর্ণ ব্লাডারে কখনোই এই ব্যয়াম করবেন না। একে চিহ্নিত করার পর ধীরে ধীরে একে সংকুচিত করুন, কিছুক্ষণ ধরে রাখুন ও ধীরে আবার ছেড়ে দিন। এভাবে আস্তে আস্তে আপনাকে চেষ্টা করতে হবে দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ বার করতে। এর সুবিধা হচ্ছে আপনি দৈনন্দিন কাজের মাঝেই এটা করতে পারেন, যেমন ফোনে কথা বলার সময় বা দুপুরে বিছানায় শুয়ে একটু এলিয়ে নেয়ার সময়ও। 

৩। আড়াআড়িভাবে মেঝেতে বসা (Crisscross floor sitting) – স্কুলের বাচ্চাদের মতো মেঝেতে আড়াআড়িভাবে বসা। এর ফলে উরুর ভেতরের দিক প্রসারিত হয় ও পায়ে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়। এসবই স্বাভাবিক প্রসবের জন্য উপকারী। 

৪। নিতম্ব গোটানো বা পেলভিক আন্দোলিত করা (Hip Tucks or Pelvic Rocks) – মা এই ব্যয়াম করার সময় চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে থাকবে। প্রথমে পিঠের নিচের অংশকে ঝোলাবে, এরপর একে সোজা করবে ও শেষে নিতম্ব নিচের দিকে গুটিয়ে আনবে। একে সঠিকভাবে রপ্ত করে পারা একটু কঠিন তবে ঠিকমতো করতে পারলে এটা পিঠের ব্যথার জন্য আরামদায়ক। প্রতিদিন কয়েকবার করলে কন্ট্রাকশনের সময় জরায়ুকে সামনের দিকে যেতে জরায়ুর পেশীকে তৈরি হতে সহায়তা করবে।

৫। উবু হওয়া (Squatting) – আপনার জেনে রাখা ভালো যে, যেমনটা আমরা নাটক, সিনেমায় দেখি বা বর্তমানে বেশিরভাগ হাসপাতালে প্রচলিত আছে যে গর্ভবতী মা প্রসব করার জন্য বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে আছে সেটার বিপরীতে উবু হওয়া হচ্ছে মানুষের জন্য স্বাভাবিক প্রসব ভঙ্গী। শোয়া অবস্থার সাথে তুলনা করলে উবু হওয়া অবস্থায় মায়ের পেলভিস প্রায় ৩০% হারে খুলে যায়। এই ব্যয়াম মায়ের পেলভিসের পথকে নমনীয় করার পাশাপাশি পায়ে শক্তি যোগাবে ও পেরিনিয়ামকে প্রসারিত করবে। উবু হওয়া একরকম আছে যা শূণ্যে বসার মতো, আরেকটা আছে লো-কমোডে বসার মতো। এছাড়াও ইউটিউবে আরও কয়েক প্রকারের উবু হওয়ার পদ্ধতি দেখতে পারেন। 

মনে রাখবেন, গর্ভাবস্থায় ব্যয়াম করার আগে আপনার ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিবেন। ধীরে শুরু করবেন ও একটা ব্যয়াম রপ্ত হয়ে গেলে তারপর এর পরিমাণ বাড়াতে পারেন তবে কখনোই শরীরের ওপর চাপ দিবেন না ও গর্ভকালীন ব্যয়ামে কখনো ব্যথা লাগার কথা না। 

এছাড়াও, গর্ভাকালীন উপসর্গ হিসাবে শরীরের নানা অঙ্গে ব্যথা হতে দেখা যায়। এসবের জন্যও কার্যকরী ব্যয়াম আছে যা আপনাকে সহজেই আরাম দিতে পারে। এর মাঝে হাতে একধরণের ব্যথা হতে দেখা যায় যাকে কারপাল টানেল (Carpal Tunnel) বলে যখন মনে হয় যে হাত বুঝি অবশ হয়ে আসছে। গর্ভাবস্থায় হাতে পানি আসার ফলে কবজির মধ্যবর্তী নার্ভে চাপ পড়ে ও এই ব্যথা হয়। 

আরও এক ধরণের পায়ে ব্যথা হতে দেখা যায় যাকে প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস (Plantar Fasciitis) বলা হয়। গর্ভাবস্থায় ওজন বৃদ্ধির কারণে এই ব্যথা হয়। 

উপরের দুইটি অসুবিধাই গর্ভাবস্থা ছাড়াও একজন নারী যখন মা হন ও সন্তান প্রতিপালন করেন বা ঘরের কাজ করার সময়ও হতে পারে। কারণ দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গীতে হাত দিয়ে কোন কাজ করলেও কারপাল টানেল ব্যথা হতে পারে, যেমন মনে করুন বাচ্চাকে হাতের ওপর রেখে ঘুম পাড়ানো বা দুধ খাওয়ানো অথবা প্লেট-বাসন ধোয়া। একইভাবে, অনেকক্ষণ বাচ্চা কোলে নিয়ে হাঁটা, দাঁড়ানো বা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে কাটাকুটি, রান্নাবান্না করা থেকেও প্লান্টার ফ্যাসিয়াইটিস ব্যথা হতে পারে। ইউটিউবে এসব ব্যথার জন্য ভালো বেশ কিছু ব্যয়াম দেখানো আছে। আমি বলব যে, ব্যথা চলে যাওয়ার পরও এসব ব্যয়ামের চর্চা করলে আপনার শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গগুলো ভালো থাকবে, ইনশাল্লাহ।

এ তো গেল গর্ভাবস্থাজনিত ব্যয়ামের কথা। কিন্তু শরীরের সার্বিক সুস্বাস্থ্যে প্রতিদিন প্রায় সব অঙ্গের ব্যয়াম অত্যন্ত উপকার বয়ে আনতে পারে। ভাবছেন কোনটা দিয়ে কিভাবে শুরু করবেন? যোগব্যয়াম এক্ষেত্রে উত্তম পছন্দ হতে পারে। মুসলিম হিসাবে, যোগব্যয়ামের ভুল আধ্যাত্মিক দিকগুলো এড়িয়ে গিয়ে এর শারীরিক কসরত থেকে আমরা লাভবান হতে পারি। তবে এলোমেলোভাবে না শিখে এই বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারো থেকে শিখে নেয়াই উত্তম। প্রসব পরবর্তী মুটিয়ে যাওয়া শরীরকে সুগঠিত করতে পারে প্রতিদিন ব্যয়াম। এবং বলাই বাহুল্য, এর সুপ্রভাব আপনার দাম্পত্য জীবনেও পড়তে দেখবেন অচিরেই। 

এখন হয়ত আপনি ভাবছেন কিভাবে বাচ্চা নিয়ে ব্যয়াম করবেন? একবার শুরু করেই দেখুন না এটা কত মজার ব্যপার! প্রথমে আপনার বাচ্চা আপনার এসব বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি কৌতূহল নিয়ে দেখবে। এরপর ছোট ছোট হাত পা দিয়ে সেও আপনাকে অনুকরণ করতে শুরু করবে। তখন আপনার মজা পাওয়ার পালা। কখনো সে হয়ত আপনার পিঠে বা পায়ের ওপর উঠে বসবে। আপনার আর আপনার বাচ্চার জন্য প্রতিদিনের ব্যয়ামের সময়টা হতে পারে চমৎকার ‘ফান টাইম’।

আমাদের শরীর মহান আল্লাহর দেয়া এক আমানত। ভালোবেসে এর যত্ন নেয়া আমাদের উচিত। নিজেকে ভালবাসুন, ভালো রাখুন। আপনার সন্তানও ভালো থাকবে, ইনশাল্লাহ।

তথ্যসূত্রঃ 

বই AMANI Birth, লিখেছেন Aisha Al Hajjar

Carpal tunnel syndrome in pregnancy (natural remedies)

Heel Pain and Treatment during Pregnancy

ছবিঃ 365psd.com, sangopan.com, MS Trust, NetClipart

এই আর্টিকেল রিভিউ করেছেনঃ

ডাঃ ফাতেমা ইয়াসমিন

এফসিপিএস(অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলজি)

কনসালট্যান্ট, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা