এই মায়ের প্রথম ডেলিভারির গল্প পড়ুন

দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সি সবদিক দিয়েই প্রথম প্রেগন্যান্সি থেকে ভিন্ন ছিল। ফার্স্ট ট্রাইমেস্টারে প্রচন্ড দুর্বলতা, বমিভাব আর অরুচিতে ভুগেছি।সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে শুরু হল বেশ তীব্র পেলভিক পেইন।  ব্যথায় বসতে বা হাটতে পারছিলাম না, কেবল শুয়ে বা দাড়িয়ে থাকলে আরাম পেতাম।

থার্ড ট্রাইমেস্টারে এল শ্বাসকষ্ট। খুব বেশি এক্টিভ থাকা কিংবা এক্সারসাইজ করা সম্ভব হচ্ছিল না। বসার সুবিধার জন্য বার্থ বল কিনে নিয়েছিলাম, সেটা ব্যবহার করে রেগুলার সহজ কিছু এক্সারসাইজ করতাম। ডেইলি ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতাম যাতে লেবারের মত স্ট্রেসফুল সময়ে সহজে এগুলো প্রয়োগ করতে পারি।

 ৩৪-৩৫ সপ্তাহের দিকে পেলভিক পেইন কিছুটা কমায় হাটা বাড়াই, লেবার সহজ করবে এমন এক্সারসাইজ করা বাড়িয়ে দিই। Optimal Fetal Positioning এর দিকে বেশি ফোকাস করছিলাম কারন এতে লেবার সহজ আর শর্ট হবার সম্ভাবনা বাড়ে।

খেজুর আর পানি ছিল সারাদিনের সংগী। আগের লেবার ইন্ডিউসড ছিল। তাই কিছুটা ভয় ছিল এবারো ইন্ডাকশন লাগবে কিনা। এই সময়ে হাস্পাতালের জন্য ব্যাগ গুছিয়ে ফেললাম। মনেপ্রাণে নর্মাল ডেলিভারি চাইলেও সিজারিয়ান হলে যতদিন থাকতে হবে সেই হিসেবেই ব্যাগ গুছিয়ে নিই ^_^

কারন আল্লাহই উত্তম ফয়সালাকারি।

৩৮ সপ্তাহ ৩ দিনের সকাল থেকেই ১০-১২ মিনিট ইন্টারভালে ক্র‍্যাম্পস হচ্ছিল। দুপুরে মিউকাস প্লাগ যেতে শুরু করল অল্প। সারাদিনই হাটছি, স্কোয়াট করছি আর লেবার  ইজি করার এক্সারসাইজ গুলো করছি।

রাতে ইন্টারভাল কমে ৬-৭ মিনিটে আসলো, তবুও আমি সিউর হতে পারছিলাম না এটাই লেবার কিনা, যেহেতু ব্যথা সহ্য করতে পারছি। আস্তে আস্তে ব্যথা বাড়তে লাগল। রাত ৩টা থেকে আর শুয়ে থাকতে পারছিলাম না। ৩ মিনিট পর পর কন্ট্রাকশান হচ্ছিল। হাটছিলাম আর কন্ট্রাকশানের সময়ে আরামের জন্য all fours পজিশানে যাচ্ছিলাম। 

ফজরের পরে হাসপাতালে রওয়ানা হলাম। তখন ২ মিনিট ইন্টারভালে কন্ট্রাকশন হচ্ছে। হাসপাতালে যাওয়ার পর সিটিজি করার জন্য আধাঘন্টা শুইয়ে রাখা হল, প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল!  ৩ সেমি সার্ভিক্স ওপেন দেখে ডিউটি ডাক্তার বললেন আরো অনেক সময় লাগবে।

রাতে ঘুম না হওয়ায় শারীরিক ভাবে দুর্বল লাগতে শুরু করল। কেবিন নেয়া স্বত্ত্বেও আমাকে লেবার ওয়ার্ডে রাখা হল, হাসব্যান্ড ঢুকতে পারলোনা। একা হাটছিলাম ওয়ার্ডের এ মাথা থেকে ও মাথা। করোনার কারনে সবাই দূরে দূরে। কন্ট্রাকশান আসলে বিছানার স্ট্যান্ডে মাথা রেখে নিশ্বাস নিচ্ছিলাম, মাসল রিল্যাক্স করার চেষ্টা করছিলাম। ব্যথার তীব্রতায় খালি একটা দুয়াই বের হচ্ছিল- লা হাওলা ওয়া লা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ

আশেপাশে কাউকে না পেয়ে হতাশ ফিল করতে শুরু করলাম, কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। 

এক ঘন্টা পর ডিউটি ডাক্তার এসে চেক করতে চাইলেন, আমি বলেছিলাম কন্ট্রাকশানের সময়ে চেক করতে দেব না, উনি বেশ বিরক্ত হলেন, তবে ওয়েট করলেন। দেখা গেল ৬ সেমি ওপেন হয়েছে। এসময়ে আমাকে উনারা বললেন অক্সিজেন দেবেন, যেন বিছানায় শুয়ে থাকি। কিন্তু সেসময়ে শুয়ে থাকলে ব্যথা সহ্য করতে পারব না তাই আমি জোর করেই বললাম যে দাড়িয়েই থাকব।

হঠাতই ব্যথা অসহনীয় হয়ে গেল। ফুল ডায়লেশানের কাছাকাছি সময়ে ব্যথা এমন বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক জানতাম তবুও অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। কন্ট্রাকশানের মাঝে আর ব্রেকও পাচ্ছিলাম না। (যতই প্রিপারেশন নেয়া হোক না কেন, সেই সময়ে রিমাইন্ডার বা সাপোর্ট দেয়ার মত কাউকে পাশে না পেলে একজন মায়ের জন্য শান্ত থাকা প্রায় অসম্ভব। বুঝতে পেরেছি, একজন মায়ের জন্য নিজের প্রিপারেশানের পাশাপাশি সাপোর্টিং মানুষ পাশে থাকা কতটা জরুরি। সঠিক ডাক্তার খুজে নেয়াও খুবই প্রয়োজন, আমার রেগুলার ডাক্তার, যিনি বেশ সাপোর্টিভ বলেই পরিচিত, তিনি ডেলিভারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।) 

আমাকে লেবার রুমে নেয়া হল। আমি ঠিক করে গিয়েছিলাম শরীরে নিজে থেকে পুশ করার urge না আসা পর্যন্ত পুশ করব না। কিন্তু একা থাকায় নার্স-ডাক্তারের জোরাজুরিতে আমি অসহায় হয়ে গেলাম। জোর করে আমাকে বেডে তোলা হল, সোজা হয়ে শুয়ে থাকতে জোর করছিল- যা ছিল প্রায় অসম্ভব।  আমি এক সাইড হয়ে শুতে চাচ্ছিলাম, আমার পা বারাবার টেনে সোজা করে দিচ্ছিল নার্স। ডিউটি ডাক্তার বললেন,  ডায়লেশান হয়েছে পরের কন্ট্রাকশানে পুশ করবেন। আমি সেই সময়ে খুবই হতাশ ফিল করছিলাম। মনে হচ্ছিল আমার হাত পা বাধা, নিজের জন্য কিছুই করতে পারছিনা। পুশ করার ব্যাপারেও কিছু প্রিপারেশন নিয়েছিলাম যাতে এপিসওটমি না লাগে বা টিয়ার না হয়। কিছু বলার আগেই ডাক্তার এপিসিওটমি করলেন। বারবার পুশ করতে বললেন। কন্ট্রাকশান আসার আগেই আবার পুশ করতে জোর করা হচ্ছিল। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর ইচ্ছায় লেবার রুমে নেয়ার আধাঘন্টার মধ্যে, দুইবারের পুশে বাবু হল। 

আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ আমার এক্টিভ লেবার মাত্র দেড় ঘন্টার মত ছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় সেসময়ে বেশ শান্ত থাকতে পেরেছি। কিন্তু লেবার রুমের সবার অসহযোগীতার কারনে শেষের সময়টুক আমার জন্য খুবই কষ্টকর ছিল।  যদি প্রথম থেকে নিজের কোন প্রিপারেশন না থাকতো তাহলে হয়ত  শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে পারতাম না। 

তখন বুঝতে পেরেছি একজন মায়ের জন্য নিজের প্রিপারেশানের পাশাপাশি সাপোর্টিং মানুষ পাশে থাকা কতটা জরুরি।

আর এই সাপোর্ট প্রসংগে আমার হাসব্যান্ডের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। প্রেগন্যান্সির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনিই আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহস দিয়েছেন। লেবারে হেল্প করার জন্য প্রিনেটাল ক্লাসের ভিডিও দেখেছেন। লেবার পেইন সহনীয় করার জন্য ম্যাসাজ, কাউন্টার প্রেশার টেকনিক শিখেছেন, আল্লাহুম্মা বারিক লাহু।  যদিও আল্লাহর ইচ্ছায় পরিস্থিতির কারনে তিনি আমার সাথে থাকতে পারেন নাই। তবুও তার সাপোর্ট প্রত্যক্ষ- পরোক্ষভাবে আমাকে অনেক সাহস দিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। 

প্রথম ডেলিভারির সুন্দর অভিজ্ঞতার তুলনায় দ্বিতীয় ডেলিভারি কিছুটা ভিন্নই ছিল। আলহামদুলিল্লাহ নতুন করে অনেক কিছুই শিখতে আর অনুধাবন করতে পারলাম।

বোনদের প্রতি অনুরোধ থাকবে লেবারের জন্য প্রথম থেকেই মানসিক,শারীরিকভাবে প্রিপারেশন নেবেন ইন শা আল্লাহ।  লেবার নিঃসন্দেহে খুবই যন্ত্রনাদায়ক। কিন্তু তা তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহজ করার জন্য টেকনিক আমরা চাইলেই শিখে নিতে পারি। আর অবশ্যই চেষ্টা করবেন সাথে সাপোর্টিভ আপন কাউকে রাখতে এবং তাকেও উতসাহিত করবেন লেবারে সাহায্য করার ব্যাপারে জানতে।

(লিখেছেনঃ উম্মে সাফিয়্যাহ)

ছবি কৃতজ্ঞতা: iStock