আমার ছেলে আলী মারা যাওয়ার পরদিন থেকে কেমন জানি একটা জীবনে চলে এসেছিলাম। মনে হয়েছিল, একটা বাঁধা ধরা রুটিন জীবন হঠাৎ শেষ হয়ে গেলো! আমি পুরোপুরি অবসর হয়ে গেলাম হঠাৎ!

আইশার বাবার অবস্থা হোয়েছিল আরো কষ্টের। প্রতিদিন সকাল ৮ টায় আলীর nicu তে কল করে ওর খবর নিতো। ওকে কবর দিয়ে এসে নিজের অজান্তেই কবরস্থানের লোকদের ঠিক ৮ টায় কল করে জানতে চাইছিল, ” ওর কবরের পাশে বাঁশের বেড়া টা দিয়েছেন?” বেড়া দেয়ার পর জিজ্ঞেস করত কল করে , ” বেড়া টার রং সবুজ করার কথা ছিল, করেছেন?”

আমি ওকে বলেছিলাম এসব বন্ধ করতে নাহলে পাগল হয়ে যাবে। আমার মেয়ে আইশা, ছোট কোন বাচ্চা দেখলে মন খারাপ করে ফেলত। আমার ছোটবোনের একটা ছেলে হয় আলীর পর। ও যেন আমরা আইশার সব কিছু ঘিরে রাখলো। আমার মন খারাপ ছিল, মনে হতে লাগলো, নিশ্চয়ই কোনো বিরাট পাপ করেছি যার শাস্তি পাচ্ছি। তখন এক আপু বলেছিলেন, “তুমি আল্লাহর ব্যাপারে যা ভাববা , ওনাকে তেমনি পাবা। যদি মনে করো পাপ করেছো শাস্তি পাচ্ছো তাহলে তাই আর যদি ভাবো আল্লাহ্ মর্যাদা বৃদ্ধি করছেন তাহলে তাই। আল্লাহর ব্যাপারে ভাল ধারণা রাখবা। আর মুমিনদের সেটাই কাজ।

“আলহামদুলিল্লাহ। এরপর থেকে মনে হলো, ইসতিগফার চালিয়ে যাবো আজীবন। আর আল্লাহর কাছে আর একবার মা হাওয়ার তৌফিক চাবো।

প্রথমে মাথায় আসলো আমার হাতে যা আছে তা আগে ঠিক করি। যেমন আমার ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ঠিক করলাম যেভাবেই হোক ওজন কমাবো। একজন ডাইটিসিয়ানের শরণাপন্ন হলাম। উনি যা যা বললেন পালন করলাম। তারপরও মাঝে মধ্যে মিস হতো অনেক কিছু। ৮ মাস লাগলো ২১ কেজি ওজন কমাতে। আলহামদুলিল্লাহ্ ওজন কমাতে পারলাম।

এর পর ৩জন ডাক্তারের সাথে contact করলাম। তারা আমাকে এপ্রিশিয়েট করলেন আমার ওজন কমানোর জন্য। আল্লাহর কাছে চাইলাম আল্লাহ্ আমার দুয়া কবুল করলেন। আলহামদুলিল্লাহ্। আমি আমার আফিয়াকে কনসিভ করলাম। সবসময় ভয়ে থাকতাম। কোথাও বের হতাম না। সব কিছুতেই মনে হতো স্ট্রেস হয়ে যাবে। এভাবে যখন ২০ সপ্তাহ চলে তখন হঠাৎ এক রাতে আমার প্যানিক অ্যাটাক হলো। ঘুমাতে পারলামনা। ঘুমাতে গেলে মনে হলো কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে দেয়! আর আমার হার্টবিট বেড়ে যায় আর পিঠ টা গরম হয়ে যায়! আমার এই পরিস্থিতি কেউ বুঝতে পারছিল না। তবে আমি বুঝতে পারছি কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। আমাকে বলা হলো ডেকে বিপদ নিয়ে আসছি! কিন্তু কাউকে বুঝতেই পারছিলাম না, জিনিস টা আমার হাতে নাই! আইশার সময় পোস্ট পর্টাম ডিপ্রেশনের অভিজ্ঞতা ছিল, কেন জানি ঐ অভিজ্ঞতার সাথে মিল পাচ্ছিলাম। কেউ গ্রাহ্য না করলেও আমি একরকম জোর করেই আমার ডাক্তারের কাছে গেলাম। আলহামদুলিল্লাহ্ খুবই ভালো একজন ডাক্তার এবং মানুষ, ডক্টর নুরুন্নাহার খানম ম্যাডাম। আমাকে অভয় দিয়ে বললেন এটা কিছুই না প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। Anti depressant medicine দেওয়া লাগবে। প্রেগন্যান্সি তে নিরাপদ এমন একটা মেডিসিন প্রেস্ক্রাইব করে দিলেন আলহামদুলিল্লাহ্। বাংলাদেশে মানুষ ডিপ্রেশন কে পাগলামি ভাবে! পাগল হওয়া হলো হ্যালুসিনেশন। কিন্তু ডিপ্রেশন মানসিক একটা রোগ যার চিকিৎসা আছে। এর সাথে অনেক “দ্বীন দার” আবার দ্বীনের কমতি বের করার চেষ্টা করেন! আল্লাহ্ ভালো জানেন কার দ্বীনদারি কম আর বেশি। তবে শরীরের রোগের চিকিৎসা নেওয়া যদি দ্বীনের ঘাটতি নাহয় তাহলে মনের রোগের চিকিৎসা নিলে হবে কেন?আমার ঐ ডিপ্রেশনের কষ্ট প্রায় ২০ দিন ভোগ করতে হয়েছিল। তারপর ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। প্রথমে চেষ্টা করেছি নিজে ঠিক হতে পারি কী না তা দেখতে। ডিসেম্বর মাসে হয়েছিল এই ঘটনা। একেকটা দিন পার করতাম আর শুকরানা সিজদা দিতাম। ক্যালেন্ডার টা দাগে দাগে ভরে গিয়েছিল!

৩১ ডিসেম্বর কিযে মধুর লাগছিল! মানুষ চায় দিন আস্তে যাক আর আমি দুআ করতাম তাড়াতাড়ি পার হতে! January ভাল কাটলো। আলহামদুলিল্লাহ্। February মাসের ২তারিখে ম্যাডামের appointment ছিল। ঐদিন গিয়ে আরেকটা পরীক্ষার সম্মুখীন হলাম! আমার প্রেসার বাড়তি! ৩ বার মাপার পরও ওই বাড়তি! ম্যাডাম বললেন, ” সমস্যা নাই, রোগ হলে ওষুধ খেতে হবে এটাই। কোনো চিন্তা করবেন না। ওষুধ লিখে দিচ্ছি খাওয়া শুরু করেন। আল্লাহ্ ভরসা। ” আমি একটুও ভয় পেলাম না দেখে মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ্ বলছিলাম। আইশার বাবা একটু ঘাবরে গিয়েছিল। আমি ওকে স্বান্তনা দিলাম। February মাস টাও ভাল কাটলো আলহামদুলিল্লাহ্। আমার দিন কাটছে ভয়ে, আশায়। ক্যালেন্ডার টার অবস্থা বেহাল!February মাসের শেষ দিনটা মনে হয়েছিল আনন্দে কেক কাটি! 🙂 আলহামদুলিল্লাহ্। মার্চ মাস চলে আসলো। মার্চের ২ তারিখে আমার প্রেসার আবার বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে ৩২সপ্তাহ পার করেছি প্রেগন্যান্সির আলহামদুলিল্লাহ্। ম্যাডাম আরো কড়া মেডিসিন দিতে বাধ্য হলেন। আর বললেন যদি কন্ট্রোল করে ২২তারিখ পর্যন্ত যাওয়া যায় তো ভালো। কারণ ২২তারিখ ৩৭ সপ্তাহ শেষ হবে। নাহলে আগেই ডিসিশন নিতে হবে। আমি ঘাবড়াই নাই। এর আগে ফেব্রুয়ারি তে প্রেসার বাড়ার পর আমি তেতুলের জুস খেতাম, ওটস খেতাম, লবণ ছারা তরকারি রেধে দিয়েছে আমার বহুদিনের পুরনো মেয়েটা। আল্লাহ্ ওর মঙ্গল করুন। চেষ্টা সবই করেছি। আর তাওয়াককুল করেছি সম্পূর্ণ আল্লাহর উপর। আমার মাথায় ছিল যা হবে ভালো হবে, আল্লাহ্ দেখেছেন আমার চেষ্টা, আল্লাহ্ জানেন কোনটাতে আমার ভালো। অবশ্যই তাই হবে যা আমার জন্য ভালো। আমি বিশ্বাস করি আল্লাহকে, রাসূলকে, ঈমানের সব সম্ভের সাথে তাকদীরের ভালো মন্দেও। আমার মনে হচ্ছিলো সারা দুনিয়ার সবাই মিলে আমার কোন ভাল করতে পারবে না , আল্লাহ্ যদি না চান। আর কেউ আমার খারাপ করতে পারবেনা, আল্লাহ্ যদি না চান। তাই দেখে যাচ্ছিলাম কী হয়। আর একেকটা দিন পার করেছি, শুকরানা সিজদাহ জারি আছে আলহামদুলিল্লাহ্।

ম্যাডাম বলেছিলেন ২ সপ্তাহ পর একটা আল্ট্রাসাউন্ড করতে। ২সপ্তাহ আগে একটা করেছিলাম সেখানে বাচ্চা ১সপ্তাহ পিছানো দেখাচ্ছিল। তাই একটু ভয় পেয়েছিলাম। ম্যাডাম বললেন ১ সপ্তাহ ডিসপ্যারিটি থাকতে পারে। এটা নরমাল। আর ম্যাডাম বললেন বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল রাখতে। ২সপ্তাহ পার হওয়ার ২ দিন আগে মনে হলো বাচ্চা কম নড়ছে! ঐদিন খুব ভয় পেলাম! পেট ধরে শুয়ে শুয়ে কান্না থামাতে পারলামনা। আল্লাহকে শুধু বলছিলাম “আল্লাহ্ আপনি আল ওয়াহহাব, আপনার কোনো অভাব নাই, আমি অভাবী, আমার অভাব পূরণ করে দেন। ” আর দুআ করছিলাম ” আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল আফিয়াতা ফিদ দুনইয়া ওয়াল আখিরাতি।” অর্থ: আল্লাহ্ দুনিয়া ও আখিরাতে সুস্থতা ও নিরাপত্তা দেন। এই দুয়ার থেকেই আফিয়ার নাম করণ বলতে পারেন। আইশার বাবা কে বলতেই ও বললো তক্ষুনি আল্ট্রাসাউন্ড করতে নিয়ে যাবে। ও অফিসে বলে দিল আজকে যেতে পারছেনা। আল্ট্রাসাউন্ড করলাম সকালে। ৩৫ সপ্তাহ চলছিল কিন্তু আফিয়া বেড়েছে ৩২ সপ্তাহ পর্যন্ত! আর পানি শুকিয়ে বর্ডার এ চলে এসেছে! আমরা ম্যাডাম কে কল করলাম উনি ইমিডিয়েট ডিসিশন নিতে বললেন। আমি তখন কেমন যেন শক্ত হয়ে গেছি! মনে হচ্ছিল আমার আফিয়াও কি থাকবেনা আমার কাছে! আইশা, আবদুল্লাহ কান্না শুরু করে দিলো। ওদের কাদতে দেখে আমিও ভেঙে পড়লাম। আর বললাম, ” যাই হোক বাবারা তোমরা আল্লাহ কে খারাপ ভাব বা না। নিশ্চয়ই উনি জানেন আমাদের ভালো কোনটাতে আছে। তোমরা শুধু দুআ করো।”Nicu সাপোর্ট লাগবে তাই উত্তরা তে কোনো হসপিটাল ভরসা পাচ্ছিলাম না। বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হসপিটাল এর মাসুমা জলিল ম্যাডাম কে দেখিয়েছিলাম একবার। খুবই ভালো মানুষ এবং ডক্টর। দূরত্বের কারণে উত্তরা তেই দেখিয়েছিলাম। আর সৌভাগ্যক্রমে নুরুন্নাহার ম্যাডামের মত একজন গুণী ডক্টরের আন্ডার এ ছিলাম। Nicu সাপোর্ট চিন্তা করে bsh এর কথাই মাথায় আসলো। নুরুন্নাহার ম্যাডামের পরিচিত অনেক সিনিওর জুনিওর ডক্টর রা ওই হসপিটালে কর্মরত। তাই ম্যাডাম আমার অনুরোধ রাখলেন। Bsh e এসে আমার অপারেশন করতে রাজি হলেন।

দুপুরে খেয়ে রেডি হলাম। আমার বাসার মেয়ে গুলাকে জড়িয়ে ধরে কেদেই দিলাম। ওকে ধন্যবাদ দিলাম, আমার জন্য অনেক করেছে। আমার আলীর সময় অনেক রেধে খাইয়েছে, ওজন কমানোর সময় কম তেল দিয়ে আলাদা করে আমার জন্য রেধেছে আবার আফিয়ার সময় লবণ ছাড়া তরকারি, তেতুলের জুস, ডাবের পানি সব আমার সামনে পরিবেশন করেছে। ওকে আল্লাহ্ উত্তম প্রতিদান দিন। আমার জন্য ও একটা আল্লাহর নিয়ামত ।আমার বাচ্চা ২টা খুব ভয় পেয়েছিল। ওদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল আবার ওদের বোনের খারাপ কিছু হবার খবর শুনবে হয়ত! চোখে মুখে আতঙ্ক। ওদের দেখে ভেঙে পড়ছিলাম। তারপর আবার মনে হয়েছে সব চেষ্টা করেছি, এখন আল্লাহ্ যা করবেন তা খুশি মনে মেনে নিবো ইনশা আল্লাহ্।

আইশা, আবদুল্লাহ কে আমার ছোটবোন আর বড়বোনের কাছে রেখে উঠে গেলাম গাড়িতে। আমার গাড়ি না যাওয়া পর্যন্ত আমার বাচ্চা২টা দাঁড়িয়েই ছিল. হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমার বাবার কমপক্ষে পাঁচটা কল আসলো আমার হাজবেন্ডের ফোনে। আবেগ খুব সহজে যে মানুষটা শো করে না সে আজকে এমন ভাবে বার বার কল করছে! বুঝতে পারছি অনেক বেশি টেনশন করছে। আম্মু অস্থির হয়ে গেছে খবর শোনা মাত্রই। সবাই আসছে হাসপাতালে, আমরা আগেই রওনা হয়ে গিয়েছিলাম। আম্মু আর বাবা চিন্তা করছে তাদের সন্তানের কথা আর আমি ভাবছিলাম আমারটার কথা। নিজের জীবনের কী হবে সেটা মোটেই চিন্তায় ছিল না। একটা ভয় আর আশা মিশ্রিত অনুভূতি কাজ করছিল। আলহামদুলিল্লাহ্ , আল্লাহ্ সাহায্য করেছেন স্টেডি থাকার ক্ষেত্রে। হাসপাতালে পৌঁছে ফর্মালিটিজ পূরণ করে আমাদের কেবিনে দেয়া হলো। মাসুমা জলিল ম্যাডামের সাথেও একবার আমার হাসব্যান্ড কথা বলে নিয়েছে। নুরুন্নাহার ম্যাডাম মাসুমা ম্যাডামের সিনিওর তাই উনি ম্যাডামের সাথে ওটি তে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন! আমি ম্যাডামদের আন্তরিকতায় অভিভূত, কৃতার্থ। পরে অবশ্য নুরুন্নাহার ম্যাডাম মাসুমা ম্যাডামকে আর ইনফর্ম করেন নি। মাসুমা ম্যাডাম নিজে অনেক ব্যস্ত তাই। পরে মাসুমা ম্যাডাম নিজে আমার কেবিনে এসে দেখা করে গেছেন! ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে মেসেজ দিয়েছি আর উনি রিপ্লাই দিয়েছেন , ” it was not a big deal. You deserved it”… আমি আশ্চর্য এবং অভিভূত ম্যাডামের নিরহংকার দেখে। আলহামদুলিল্লাহ্। আল্লাহ্ ওনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।যাই হোক, আমাদের বলা হলো ওটি রাত ৯ টায়। তখন বাজে ৫ টা। আমি যোহরের সালাতের সাথে আসর জমা করে পড়ে এসেছি। মাগরিবের নামাজের সময় ইশা জমা করেছি। ৬ টা থেকে কোনো কিছু খেতে মানা করা হল। ৮:৩০ টার দিকে আমাকে ওটি নেয়ার জন্য হুইচেয়ার নিয়ে নার্স আসলো। সবাই দুআ পড়ে ফু দিচ্ছিলো, আমার আম্মু, চাচিরা। আমার কোনো ভয় লাগলো না। ওটি তে ঢুকার আগে মনে মনে পড়ছিলাম ” আউযুবিল্লাহি তম্মাতি মিন শাররি মা খালাক”। আর মাথায় ঘুরছিল “হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি’ মাল ওয়াকিল”।ওটি তে নেওয়ার আগে পোস্ট অপারেটিভ এ নিয়ে গিয়ে একটা বেড এ শোয়ানো হলো আমাকে। Anesthesist একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ছিলেন। আমি পর্দা করি তাই পোস্ট অপারেটিভ এ আমার বিছানার চারদিকটা পর্দা টেনে দিয়েছিলেন সিস্টার রা। ভদ্রলোক আগে একজন সিস্টারের মাধ্যমে আমার কাছে পারমিশন নিলেন কথা বলার। আমি পারমিশন দিলাম কারন চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভেদে পুরুষ ডক্টরের সামনে যেতে কোনো বাঁধা নেই। উনি এসে জিজ্ঞেস করলেন , ” কেমন আছো মা?”
– ভালো
– তোমার প্রথম বাচ্চা?
– জি না স্যার, ফোর্থ।
– আরো নিবা! ( একটা হাসি দিয়ে)
– স্যার আমার থার্ড বাচ্চাটা মারা গিয়েছে।
আর পুরা ঘটনা বললাম
উনি সাথে সাথেই অবশ্য সরি বলেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ। পুরা সময় টা এরপর মনে হচ্ছিল উনি আমার বাবার মত প্রতি টা ব্যাপারে খুবই যত্নের সাথে টেক কেয়ার করলেন।
ওটি তে নেওয়ার সময় আমার পরিবারের সাথে দেখা করানো হলো। ফাইনালি ওটি তে ঢুকানো হলো। খুব অবাক লাগছিল আমি ভয় পাচ্ছিলাম না। আল্লাহ্ কী রেখেছেন আমার জন্য সামনে দেখতে চাচ্ছিলাম। ম্যাডাম আসলেন, অভয় দিলেন। ওনার সাথে এসিস্ট করলেন ডক্টর আঁখি। আমার বয়সী একজন চৌকস ডক্টর। মাশা আল্লাহ। আমি এবার বেশি দুঃ সাহসী হয়ে গিয়েছিলাম মনে হয়। কারণ অপারেশন এর যে লাইট থাকে তার দিকে তাকালেই আমি আমার পেট দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি ঠিক করলাম পুরাটা অপারেশন দেখবো! অজ্ঞান হয়ে গেলেও তো আর সমস্যা নাই! 😉 পুরাটা অপারেশন দেখলাম! সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ্ মানুষকে কী কী বিষয় জ্ঞান দিয়েছেন! ডাক্তারি বিদ্যা আসলেই মহৎ বিদ্যা! আমি সামান্য কাটা ছেরা দেখতে পারি না, আর ডাক্তাররা নির্বিকার পেট কেটে ফেললেন!যাই হোক, রাত ১০ টায় আমার আফিয়া পৃথিবীতে আসলো। আলহামদুলিল্লাহ। ম্যাডাম বলেছিলেন ফোর্থ C-section হওয়া সত্বেও খুব সহজে অপারেট করতে পেরেছেন। আর অনেক যত্ন করে যে করেছেন তা তো আমি নিজেই দেখেছি!আফিয়া কে আমার কাছেই আনা হলো না। Nicu ডক্টর ভিতরে ছিলেন। উনি সাথে সাথে ওকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ঢুকে nicu এর ডক্টর বললেন, “baby 1.6 কেজি, nicu অ্যাডমিশন লাগবে।” আমার ম্যাডাম বললেন , “অ্যাডমিট করে দেও” ।এতটুকুই, আমি বেশি চিন্তা করলাম না ওকে নিয়ে। মনে হচ্ছিল চিন্তা করে কী হবে। যা হবার তাই হবে। আর ইনশা আল্লাহ্ যা করবেন ভালো করবেন।আমাকে ঐ রাত টা পোস্ট অপারেটিভ এ কাটাতে হলো। পরদিন সকালে কেবিনে নেয়া হলো। আমার ব্যাথা ছিল খুবই কম। আমি ব্যাথার জন্য কোনো ওষুধ ও নেই নাই। সিস্টার রা এসে সেধে গেছেন। কিন্তু আমার অসহনীয় ব্যাথা মনে হচ্ছিল না তাই কোনো ওষুধ নেই নাই। সবচেয়ে মজা পেয়েছি আমার অবস্থায় যখন সিস্টার রা প্রশ্ন করেছেন ” ফার্স্ট baby?” উত্তরে “ফোর্থ” শুনে ওনাদের reaction দেখে! 😄

পরের দিন হাঁটাহাঁটি করেছি দেখে ওনারা আরো অবাক। আলহামদুলিল্লাহ্। আল্লাহ্ সহজ করার মালিক।আইশার বাবা জানালো আফিয়াকে nicu তে নিয়ে যাবার সময় ওর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। সেটা দেখে ওর খুবই খারাপ লেগেছে। একে তো আমি ছিলাম পোস্ট অপারেটিভ এ আর মেয়ে nicu তে, তার উপর শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল আফিয়ার, সব মিলিয়ে আসলেই আইশার বাবার উপর দিয়ে গেছে। রাতে বাইরে খেতে গিয়েছিল। ফেরার পথে nicu থেকে কল আসে। তখন বলে অনেক ভয় পেয়েছিলো! খুবই স্বাভাবিক। আফিয়াকে CPAP মেশিনে দিতে হয়েছে সেটা জানতে কল করেছিল।আমি পরের দিনও ওকে দেখতে যাই নাই। গিয়েছি ২ দিন পর। আইশার বাবা বলছিল আমার মন খারাপ হবে , অনেক ছোট বাচ্চা, তার উপর CPAP মেশিনে আছে! আমি ওকে অভয় দিলাম, আমার অভিজ্ঞতা লাইফ সাপোর্টে নিজের ছোট্ট বাচ্চাটাকে নিস্তেজ পড়ে থাকতে দেখা, তাই CPAP কোন ব্যাপারই না! আইশার বাবা আলীর সময় খুব কম ঢুকেছিল nicu তে । আমিই বেশি গিয়েছি। কত ধরনের কেস যে দেখেছি! ওর আইডিয়া নাই!

যাইহোক, আমি nicu তে দেখতে গেলাম। ওকে দেখে অনেক আশা জাগল। ওকে দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছিল না, যেটা আলীকে দেখে মনে হয়েছিলো! আলহামদুলিল্লাহ্। আমি দুআ পড়ে ফু দিয়ে আসলাম। Nicu তে থাকা সব বাচ্চাদের দুআ পড়ে ফু দিয়ে আসলাম। রুমে এসে দুইজন মিলে শুকরানা সিজদা দিলাম। ডক্টর রাও আশা দিয়েছিলেন যে ও ভালো আছে আলহামদুলিল্লাহ্। CPAP মেশিন থেকে বের হলেই খাবার স্টার্ট করবে। খাবার স্টার্ট এর কথা শুনে ভয় লাগলো আমার। কান্না চলে আসলো। আইশার বাবা কে বললাম আবার যদি অমন হয়! ও আমাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করলো আর আল্লাহর উপর আস্থা রাখতে বলল। ৪ দিন পর CPAP মেশিন খোলা হল। কিন্তু অক্সিজেন চলছে খুব কম লেভেল। খাবার স্টার্ট হলো। নাকে পাইপ দিয়ে খাবার দেয়া হবে। ৪ ঘণ্টা পরপর ১ এমএল। আমি ছাড়া পেয়েছিলাম তিনদিনেই কিন্তু ওর জন্য কেবিন ছাড়লাম না। আইশার বাবা রুমে বসেই অফিস করছিল, মিটিং করছিল। ওর ফিডিং যখন ১০ এমএল করা হলো ৩ ঘণ্টা পর পর, তখন সেটা ৬ ষ্ঠ দিন। ওই দিন ওর অক্সিজেন খুলে দেয়া হলো। আর আমাকে সরাসরি ব্রেস্ট ফিডিং এর জন্য ডাকা হল। প্রতিটা তে শুকরানা সিজদা জারি ছিল। আলহামদুলিল্লাহ্। ভয়ে ছিলাম আফিয়া টেনে খেতে পারবে কি না! আলহামদুলিল্লাহ্ ও পারলো। এভাবে ৯ ম দিন ওকে কেবিনে দিয়ে দেয়া হল। আর ১০ দিন রিলিজ দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে ১০ দিন হাসপাতালেই ব্যস্ত ছিলাম। এদিকে আবদুল্লাহ অবিশ্বাস করছিল যে ওর বোন ভালো আছে, ও কে নিয়ে আমরা আসলেই বাসায় আসবো! আমাকে কল করে শুধু জিজ্ঞেস করত, “তুমি কি ওকে কোলে নিসো? মা, তুমি কবে আসবা?” বলে কাদত। আফিয়া কে নিয়ে যতটুকু না ‌কষ্টে ছিলাম, তার থেকে বেশি কষ্টে ছিলাম আমার আইশা, আব্দুল্লাহর মানসিক চাপ টা চিন্তা করে!

আলহামদুলিল্লাহ্ যে দিন বাসায় আসলাম, ওদের দুইজনের খুশি দেখে মনে হয়েছে, মা হয়ে সার্থক হলাম! আলহামদুলিল্লাহ্। জীবনে এর চেয়ে বড় পুরষ্কার নাই আমার কাছে। আলহামদুলিল্লাহ্।

আফিয়ার ডক্টর আসার আগে ওকে কিছু সাপ্লিমেন্ট প্রেস্ক্রাইব করেছেন আর বলেছেন ২৮ দিন বয়স হলে চোখের ROP টেস্ট টা করিয়ে নিতে। ROP (retinopathy of prematurity) এটা আলীরও ছিল। আলীর ২ বার লেজার চিকিৎসা লেগেছিল। যাইহোক, যারা এটা কী জানেন না, তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, এটা প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের বা লো বার্থ ওয়েইট বাচ্চাদের হবার সম্ভবনা থাকে । আর যেসব বাচ্চা রা অক্সিজেন পায়, NICU তে থাকে তাদের হবার সম্ভাবনা থাকে। ডিটেলস গুগল করলে জানতে পারবেন ইনশা আল্লাহ্।যাই হোক, আমরা আফিয়াকে নিয়ে বাসায় আসলাম, ওর জন্য ডক্টর ভিজিটর রেস্ট্রিকট করতে বলেছেন। তাই বাসায় কেউ আসছেনা। সবাই দূর থেকে দুআ করছেন।

আমরা আফিয়ার ২৩ তম দিন ওর চোখের ডক্টর কে দেখলাম। টেস্ট করার জন্য ওকে নিয়ে গেলো আমার কাছ থেকে। ওটি এর বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই ওর কান্না শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে যাই। বেশিক্ষণ লাগে নাই অবশ্য। আমাকে আশ্বস্ত করলেন ডক্টর , ও ব্যাথা পায় নাই ভয়ে কেদেছে। আমরা যখন ডক্টরের ব্রিফিং এর অপেক্ষায় তখন আলীর কথা বার বার মনে পড়েছে! ওর ও তো ভয় লেগেছিল নিশ্চয়ই! আমি বুকে নিয়ে শান্ত করতে পারি নাই! কী ভেবেছে ও? ও কি ভেবে থাকতে পারে যে কই ওর মা? ওকে শুধু কষ্টই দিচ্ছে! একটা বারও কোলে ও নেয় নাই!! এসব চিন্তা করে কান্না আটকাতে পারলাম না। যে ডক্টর আলীর লেজার করেছিল ওই ডক্টরের কাছেই আফিয়াকে নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি আলী নামটা শুনেই চিনতে পেরেছেন। আলী অবশ্য লেজার করার কয়েকদিন পরেই লাইফ সাপোর্টে চলে গিয়েছিল। মারা যাওয়ার আগে ওর একটা চোখের ব্লিংকিং ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল। ডক্টর বলেছিলেন যদি ওর হায়াত থাকে তাহলে ঐ চোখে ও দেখবেনা। পরে একটা সার্জারী লাগবে।যাই হোক, ডক্টর আসলেন, আর আমাদের জানালেন যে আফিয়ার ও ROP আছে! লেভেল ১, জোন ২। এক সপ্তাহ পর আবার যেতে বললেন। আমরা এক সপ্তাহ পর গেলাম, ঐ বার টেস্টে আসলো ওর ডান চোখে লেভেল ৩, আর বাম চোখে লেভেল ২। ওর ও লেজার লাগবে, ২ দিন পর যেতে বললেন। আমরা ২ দিন পর গেলাম। আফিয়ার লেজার হতে সময় বেশি লাগলো না।

আলহামদুলিল্লাহ্। আমি যেদিন থেকে এই পর্ব গুলো লেখা শুরু করেছি তার আগের দিনই ছিল ওর লেজার। আলহামদুলিল্লাহ্ ও ভালো আছে। ওর সুস্থতা, হায়াতে বারাকাহ, রিজিক ও ঈমান, আমলে বারাকাহ এর দুআ করি আর সেই সাথে আমার আইশা আবদুল্লাহ এর জন্যও একই দুআ। আল্লাহ্ আমাদের বাচ্চাদের আমাদের জন্য সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করেন ইনশা আল্লাহ্। আমিন।সুবহানাকা আল্লাহুম্মা আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লা আন্তা,আসতাগফিরুকা, ওয়া আতুবু ইলাইক।