আমার এই পথচলা শুরুর আগে …

মুসলিম নারীদের উত্তম প্রসব অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করতে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল আমার প্রথম সন্তানের জন্মেরও অনেক আগে। আমার বয়স যখন প্রায় সতের বছর তখন একজন নারীর সাথে আমার পরিচয় হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল যার চারটি সন্তান। সেই সময় এটা মনে হয়েছিল অনেএএএএক বেশি! অবশ্যই আমি তখন জানতাম না যে আমার নিজেরই একসময় আটটি (এখন পর্যন্ত) সন্তান হবে, সুবহানআল্লাহ! তার চেয়েও বেশি অজানা ছিল ভবিষ্যতে আমার ইসলাম গ্রহণ ও পৃথিবীর অর্ধেক পথ ঘুরে সৌদি আরবে আমার থিতু হওয়া। আমি যদি সেই সময় আমার নিজের গল্প পড়তাম তাহলে লেখিকা হিসাবে নিজেকে আমি কখনোই চিনতে পারতাম না!

আজকে পেছন ফিরে তাকালে, আমার মনে হয় এই চার সন্তানের মায়ের ব্যপারে যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কেটেছিল সেটা ছিল গর্ভাবস্থা ও প্রসবকে ঘিরে উনার প্রবল অনুরাগ। এক সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতায় উনি উল্লেখ করেছিলেন যে উনার ছোট্ট মেয়েটা মিডওয়াইফ হতে চায়। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম ভেবে যে এত ছোট একটা মেয়ে জানে মিডওয়াইফ কী জিনিস, এমন ব্যতিক্রম একটা পেশা গ্রহণ করা তো আরও পরের কথা। যখন আমি উনাকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম উনি বলেছিলেন যে উনার বড় বাচ্চারা ছোটদের জন্ম হতে দেখেছিল যেহেতু তিনি তাদের সবাইকে একজন মিডওয়াইফের সহযোগিতায় ঘরে প্রসব করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন যে উনি ব্র্যাডলে মেথড® সন্তানপ্রসব প্রশিক্ষক হিসাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। উনাকে নিয়ে আমার আরেকটা উজ্জ্বল স্মৃতি হচ্ছে এক সামাজিক অনুষ্ঠানের আসর থেকে অত্যন্ত চঞ্চলভাবে উনি দ্রুত বের হয়ে গিয়েছিলেন একজন প্রসবব্যথা চলাকালীন নারীকে প্রসবে সহযোগিতা করতে, যার বাচ্চা ব্রিচ অবস্থায় ছিল।

সেই সময়, উনার এই প্রবল অনুরাগের ব্যপারে আমি তেমন কিছু বুঝতে পারিনি, ঘরে প্রসব করার আইডিয়ার ব্যপারে আমি খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না, সবাই জানে এটা নিরাপদ না (সত্যিই কি?)। আমাদের বর্তমান বিশ্বের হাসপাতাল ও অবস্টেট্রিশিয়ান কেন্দ্রিক প্রসবের মাঝে ঘরে প্রসব করাকে অনেক প্রান্তিক কিছু মনে হয়েছিল।

যদিও উনাকে আমার অদ্ভূত ধরণের মনে হয়েছিল, প্রসবের প্রতি উনার প্রবল অনুরাগী আচরণ আমাকে আকর্ষণ করেছিল। বিষয়টা আমার পরিচিত যে কারো চেয়ে অন্যরকম ছিল। উনি মনে হতো যেন প্রসব বিষয়টাকে ভালবাসতেন, যেখানে আমার চেনাজানা বা মিডিয়াতে দেখা সব সন্তানসম্ভবা মায়েরা একে এমন এক দৃশ্য হিসাবে চিত্রিত করত যেন এটা এক ভীতিকর ঘটনা যা তাদের ভবিষ্যতে আবির্ভূত হবে

আমি নিজেকে উনার মতো এই ব্যপারে এতটা উৎসাহী মনে করিনি। “মানে, ঘরে প্রসব করা? এটা সত্যিই খুব বাড়াবাড়ি!” আমার মনে হয়েছিল। কিন্তু আমি জানতাম না যে একদিন যখন আমার নিজের সময় আসবে, আমিও এই বিষয়ের প্রতি উনার মতো প্রবল উৎসাহ, অনুরাগ এবং উত্তেজনা অনুভব করতে চাইব।

 

আমি যখন প্রথমবার সন্তান প্রত্যাশী …

আমি যখন নিজেকে সন্তানসম্ভবা বুঝতে পারলাম তখন আমার বয়স ছিল পঁচিশ। আমি একই সাথে শিহরিত ও আতঙ্কিত হয়েছিলাম। আমি সবসময়ই বাচ্চা চেয়েছিলাম এবং একসময় এমনও ভাবতে শুরু করেছিলাম যে কখনো আমার বাচ্চা হবে কি না (হাহ্‌ … এখন দেখুন, আমার আটটা বাচ্চা, আলহামদুলিল্লাহ্‌!) আমার পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে জানা একটা জিনিস আমি মনে রেখেছিলাম যেটা আমি আশা করেছিলাম যে আমাকে আরও ভালোভাবে প্রসব করার দিকে নিয়ে যাবে … ব্র্যাডলে মেথড®।

ততদিনে আমি অন্য স্টেটে চলে গিয়েছিলাম এবং আশা করছিলাম যে কাছাকাছি কারো থেকে এই ব্যপারে আরও জানতে পারব। সৌভাগ্যবশত, ফোন ডিরেক্টরিতে ব্র্যাডলে মেথডের টোল ফ্রী নাম্বারটা খুঁজে পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি ফোন দিয়েছিলাম এবং তারা আমাকে শিক্ষকদের ফোন নাম্বারের ডিরেক্টরি পোস্ট করে পাঠিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন (ইন্টারনেট আসার আগের কথা, কল্পনা করে দেখুন!)

জ্যানেট ক্যারোল তখন মাত্র প্রশিক্ষণ শেষ করে উনার প্রথম ক্লাস করাচ্ছিলেন। আমার তাতে কোন সমস্যা ছিল না। আমি কাছাকাছি একজন শিক্ষক খুঁজে পেয়েই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। আমার কোন ধারণা ছিল না কী আশা করা উচিত বা আমি কী শিখব; আমি শুধু জানতাম যে আমার আগে সমস্ত নারীকে যেমন মনে হয়েছিল প্রসব তাদের কাছে এক ভীতিকর অভিজ্ঞতা, আমি তেমনটা চাইনি। আমার আগের অপ্রত্যাশিত সাক্ষাত থেকে আমি জানতাম যে আরও ভালো কোন উপায় আছে।

আমার স্বামী ও আমি সপ্তাহের পর সপ্তাহ খুবই বিশ্বস্ততার সাথে ক্লাসগুলো করেছিলাম। আমরা শিখেছিলাম প্রসবের জন্য আমার শরীরকে প্রস্তুত করতে কোন কোন ব্যয়াম করতে হবে, কী কী পুষ্টি গ্রহণ করতে হবে নিজেকে সুস্থ ও কম ঝুঁকির মাঝে রাখতে, গর্ভাবস্থা ও প্রসবের শারীরবিদ্যা, বিভিন্ন ওষুধ ও ব্যথানাশক ওষুধের বিপদ ও এদের ব্যপারে দেয়া ভুল তথ্য, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা সেটা হচ্ছে প্রসবব্যথা কমানোর জন্য শরীরের সাথে কিভাবে কাজ করতে হবে ও কিভাবে সম্ভাব্য সেরা প্রাকৃতিক, ওষুধবিহীন প্রসব অভিজ্ঞতা অর্জন করা যাবে।

আমি চির কৃতজ্ঞ যে আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) আমাকে প্রসব করার এই পথের দিকে নিয়ে গেছেন। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে আপাত বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনা (সতের বছর বয়সে সেই প্রসবের প্রতি প্রবল অনুরাগী মায়ের সাথে দেখা হওয়া এবং অন্তঃস্বত্বা হওয়ার পর ক্লাস করা) যদি না ঘটত, আমার প্রথম প্রসব অভিজ্ঞতার জন্য নিজেকে শারীরিক, মানসিক ও আবেগীয়ভাবে প্রস্তুত করার মতো জ্ঞান আমার থাকত না। আমি সত্যিই বিশ্বাস করিই জ্ঞান ছাড়া, বেশির ভাগ নারীর মতো আমিও প্রসব করার সময় ভুগতাম এবং আবারও একই কষ্টের পুনরাবৃত্তি করতে তেমন আগ্রহী হতাম না!

আমার ছেলের জন্মের পর আমি চমৎকার অনুভব করেছিলাম, সামান্য ব্যথা ছিল, আঘাত পেলে যেমন হয়, কিন্তু সেটা এমন কিছু ছিল না যার জন্য ব্যথানাশক ওষুধের প্রয়োজন হয়েছিল। আসলে, ডাক্তার কোন একটা ওষুধ লিখে দিয়েছিল এবং যখন নার্স সেটা নিয়ে আমার রুমে এসেছিল আমি বলেছিলাম, “আমি মাত্র ব্যথানাশক ওষুধ ছাড়া প্রসব করলাম, আপনার কী মনে হয় আমার এখন এসব লাগবে?” নার্স ওষুধটা আমার বিছানার পাশের টেবিলে রেখে চলে গিয়েছিলাম, যদি লাগে এই জন্য। অবশ্যই, এখন আমার মনে হয় এটা টাকা কামানোর আরেকটা উপায় কারণ আমি নিশ্চিত আমার ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে ওইসব অব্যবহৃত ওষুধের জন্য ভালো পরিমাণ টাকা চার্জ করা হয়েছিল!

 

আমার দ্বিতীয় সন্তান প্রসব …

প্রায় দেড় বছর পর, আমি আবার হাসপাতালে গিয়েছিলাম আমার দ্বিতীয় সন্তান প্রসব করার জন্য। সন্তানপ্রসব ক্লাসের ব্যপারে আমি এবার আর ভাবিনি। আমি প্রথমবার সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে সবকিছু করেছিলাম তাই আমি জানি আমি আবার পারব, ঠিক?!?

দ্বিতীয় বার প্রসবব্যথার মাঝখানে, আমি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। এটা প্রথমবারের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল! আগেরবারের চেয়ে এত বেশি ব্যথা হচ্ছিল। আমার স্বামী দেখল যে আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি এবং শান্তভাবে বলল, “পেট থেকে শ্বাস নেয়ার কথা মনে কর।” আমার এটাই দরকার ছিল। তার কথা শুনে ব্র্যাডলে® প্রশিক্ষণ সম্পূর্ণটা আমার মনে পড়ে যেতে লাগল। আমি তৎক্ষণাৎ আমাদের যেসব পদ্ধতি শেখান হয়েছিল তার প্রতি সাড়া দিতে শুরু করলাম এবং অনুভব করলাম যে আমার ব্যথা পঞ্চাশ শতাংশ কমে গিয়েছে।

তখনই, কন্ট্রাকশনের মাঝেই, আমি ভাবলাম, “ওয়াও! কতখানি ব্যথা লাগবে তার ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ আছে! নিশ্চয়ই তারা যা শেখায় এর মাঝে কোন ব্যপার আছে!”

ব্র্যাডলে® শিক্ষক হওয়ার ব্যপারে আমি কিছুটা চিন্তাভাবনা করেছিলাম, কিন্তু আমার জীবনের সেই সময়ে এর পেছনে যতখানি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হতো তা ছিল অনেক বেশি। তারপরও, গোপনে আমি এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করে গেছি এবং একে একে প্রাকৃতিকভাবে আমার তিন, চার ও পাঁচ নাম্বার সন্তান হয়েছে।

 

সৌদি স্বামীর সাথে আমার প্রথম সন্তান প্রসব …

আমাদের পঞ্চম সন্তান জন্মের অল্প কিছুদিন পরে আমার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। বাচ্চারা এবং আমি তাদের বাবার কাছ থেকে প্রচুর মানসিক ভীতি ও অন্যায় আচরণ পেয়েছিলাম। এই সময়ই আমি স্রষ্টাকে খুঁজতে শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ্‌, প্রায় বছরখানেক পরে খ্রিষ্ট ধর্মে নিবেদিত থাকা আমি ইসলামকে খুঁজে পাই।

তালাকপ্রাপ্তা পাঁচ সন্তানের মা হিসাবে, আরও সন্তান হওয়ার আশা আমি করিনি। কিন্তু আল্লাহ্‌ উত্তম পরিকল্পনাকারী, সুবহানআল্লাহ। আমি জানতে পারলাম যে মিশরে, একজন সৌদি ভদ্রলোকের সাথে বিবাহিত থাকা অবস্থায় আমি ষষ্ঠ সন্তান গর্ভে ধারণ করছি। মিশরীয় হাসপাতালে কেমন সেবা পাব এই নিয়ে আমি শংকিত হয়ে পড়েছিলাম এবং ঘরে প্রসব করার জন্য একজন মিডওয়াইফের খোঁজ করতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে দেখলাম যে আমি এমন কাউকে খুঁজে পেলাম না।

আমি ইন্টারনেটে ব্র্যাডলের® খোঁজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। যদি এদিকে ওদের কোন শিক্ষক থাকে তাহলে নিশ্চয়ই সে এই এলাকায় কোন ভালো মিডওয়াইফের খবর জানবে। আমি হতাশ হয়ে দেখলাম যে এই এলাকার কাছাকাছি কোথাও কোন শিক্ষক নেই।

মিশরে প্রসব করার ধরণ নিয়ে আমি যত জানছিলাম, তত বেশি গুরুত্বের সাথে আমি ভাবছিলাম যে আমি নিজেই শিক্ষক হয়ে যাব। তার ওপরে, আমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেলাম যখন আমার নতুন স্বামী ঘোষণা করলেন, “আমাদের সমাজে প্রসব হচ্ছে মেয়েদের ব্যপার। আশা করি তুমি কিছু মনে করবে না, কিন্তু তুমি প্রসব করার সময় আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে চাই না।”

আমি বিধ্বস্ত হয়ে গেলাম এই কথা শুনে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে উনি তার সন্তানের জন্মের সময় সেখানে থাকতে চান না! আমি জানতাম এটা এমন একটা সময় যখন আমার তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিশেষ করে যখন আমি একটা বিদেশী সমাজে আছি এবং উনি জানেন যে আমি তাদের ভাষায় কথা বলতে পারি না। আমার সেখানে আর কেউ ছিল না এবং নিজেকে সাংঘাতিক একা মনে হচ্ছিল।

যদিও পুরো বিষয়টা আমি মন থেকে ঘৃণা করেছি, কিন্তু আমি তাঁকে ছাড়াই প্রসব করেছিলাম। আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে আমি এমন একজন ডাক্তার খুঁজে পেয়েছিলাম যিনি আমার অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রেখেছিলেন এবং আমাকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে, ব্যথানাশক ওষুধ বা মেডিক্যাল হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রসব করতে দিয়েছিলেন। আমার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য এবং আমার প্রসবকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা না করার জন্য ডাঃ মোনাকে আমি কতখানি ভালবাসি তা বলে শেষ করতে পারব না, আলহামদুলিল্লাহ্‌। তবে, সেখানে প্রসব করার সুযোগসুবিধার যে ব্যবস্থা ছিল তা নিয়ে, বিশেষ করে ডেলিভারি টেবিল নিয়ে, আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আমার অভিজ্ঞতায়, প্রসবের জন্য সহ্য করা সবচেয়ে অদ্ভুত ও কঠিন ভঙ্গীতে আমাকে থাকতে হয়েছিল সেবার। কিন্তু যা আমাকে সত্যিই কষ্ট দিয়েছিল সেটা ছিল আমার স্বামীর উপস্থিতি ছাড়া প্রসব করা। আমি স্বীকার করি, আমার অভিজ্ঞতায় মানসিকভাবে সবচেয়ে কষ্টদায়ক প্রসব ছিল এটা। যদিও এটা বুঝতে পেরে আশ্বস্ত হয়েছিলাম যে আমি স্বামীর সহযোগিতা ছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে প্রসব করতে পারি।

শারীরিকভাবে বললে, যদিও আমি যে ভঙ্গীতে ছিলাম তা কঠিন ছিল কিন্তু আমি ভালোভাবেই ম্যানেজ করতে পেরেছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ্‌। আসলে, যখন আমি আমার স্বামীকে ফোন দিয়ে বলেছিলাম যে আমি প্রসব করেছি এবং দুই ঘণ্টা পর বাসায় ফিরে বাচ্চাদের জন্য লাঞ্চ বানাচ্ছি, তাঁর খারাপ লেগেছিল। তিনি সৌদিতে ছিলেন এবং আমি পাঁচটা ছোট বাচ্চা ও একজন নবজাতককে নিয়ে একা ছিলাম। তাঁর সত্যিই মনে হয়েছিল যে আমার নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট হচ্ছে, এমনকি তাঁর সবচেয়ে কাছের সহকর্মীদের কাছে তিনি বলেছিলেন যে তাঁর অনেক খারাপ লাগছে, কারণ আমাকে সাহায্য করার আর কেউ নেই।

অবশ্যই তিনি বুঝতে পারেননি যে শারীরিকভাবে আমি সত্যিই ভালো বোধ করছিলাম, কারণ উনি সত্যিকার অর্থে প্রাকৃতিকভাবে প্রসব করা কোন নারীকে কখনো দেখেননি। তাঁর অভিজ্ঞতায় ছিল সেসব নারী যাদের ওপর দিয়ে মেডিক্যাল হস্তক্ষেপ ও ব্যথাবিহীন ওষুধ চালান হয় এবং যারা সত্যিই প্রসবের পর কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত নিজেদের দেখাশোনা করতে পারেনা, নবজাতক ও অন্য সন্তানদের পরিচর্যা করা তো আরও পরের কথা। মূলত, সৌদি আরবের সমাজে, নারীদের জন্য প্রসবের পরে (অন্ততপক্ষে) কয়েকদিন হাসপাতালে থেকে এরপর প্রসব পরবর্তী চল্লিশ দিন তার মায়ের বাড়িতে কাটান খুব স্বাভাবিক ব্যপার যেখানে তাকে অত্যাধিক আদর যত্ন করা হয়। সাধারণত এই সময়ে স্বামী দৃশ্যপটে উপস্থিত থাকে না এবং মাঝে মাঝে তার সেরে উঠতে থাকা স্ত্রী ও নবজাতক সন্তানকে দেখতে আসে। তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে আমি প্রসবের দুই ঘণ্টার মাঝে বাড়ি ফিরে এসে একা সব করছিলাম।

 

ঘরে প্রসব করতে দৃঢ়সংকল্প ছিলাম …

সপ্তম গর্ভাবস্থার সময় আমি আরেকবার ওই ভয়ানক ডেলিভারি টেবিল সহ্য করতে চাইনি এবং তখন আমি সৌদিতে ছিলাম, যেখানে আমার সন্দেহ ছিল যে ডাঃ মোনার মতো আরেকজন ডাক্তার আমি পাবো কিনা যিনি আমার প্রসব করার ধরণ গ্রহণ করতে আগ্রহী হবেন। ততদিনে আমি একা প্রসব করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলাম। এতটাই হয়েছিলাম যে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ঘরে সম্পূর্ণ একা প্রসব করব। সৌভাগ্যক্রমে, আমার এই ইচ্ছাকে আমার স্বামী সমর্থন করেছিলেন। “যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাকে অংশগ্রহণ করতে হয়,” উনি শর্তসাপেক্ষে রাজি হয়েছিলেন।

তাঁর অংশগ্রহণ করার আশা আমি আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি শুধুমাত্র নিরিবিলিভাবে একা আমার সন্তান প্রসব করতে চেয়েছিলাম। তবে যে জিনিসটা আমাদের দুইজনকেই ভাবিয়ে তুলেছিল সেটা হচ্ছে পরবর্তীতে বাচ্চার কাগজপত্র তৈরি করা। বার্থ সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কী লাগতে পারে জানার জন্য আমার স্বামী কয়েকটা মন্ত্রণালয় ঘুরেছিলেন। প্রতিটা জায়গাতেই তাঁর কথায় মানুষজন ধাক্কা খেত এবং ভবিষ্যতে “বিপদ” হতে পারে এমন সাবধানবাণী শোনাত এবং বলত যে কাগজপত্র তৈরি করতে অনেক ঝামেলা হবে। কেউ এটাকে অবৈধ বলেনি তবে অবশ্যই সবাই ভ্রূ কুঁচকে তাকাত।

হাসপাতালের রেকর্ড ছাড়া বাচ্চার কাগজপত্র তৈরি করা কঠিন হবে বুঝতে পেরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একজন ডাক্তারের সাথে দেখা করে জিজ্ঞেস করব উনি আমার গর্ভাবস্থা সত্যায়ন করে দিবেন কিনা যেন আমার সন্তান জন্ম দেয়া নিয়ে কোন প্রশ্ন না ওঠে। দেখা গেল, যখন আমি উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছি আমি নিজের অজান্তেই সক্রিয় প্রসবব্যথার মাঝে ছিলাম (আমার কয়েক সপ্তাহ ধরেই ফলস কন্ট্রাকশন হচ্ছিল এবং একে আসল বলে বুঝতে পারিনি)। যখন ডাক্তার ঘোষণা দিলেন যে আমার স্বামীর তখনই প্রসব করার জন্য আমাকে নিবন্ধিত করতে হবে, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। আমি কষ্ট করে চেষ্টা করছিলাম উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে ডাকতে। কিন্তু তিনি ততক্ষণে অ্যাডমিশন ডেস্কের দিকে অনেকদূর চলে গিয়েছেন।

যখন আমি পোশাক পড়তে চেষ্টা করছিলাম, আমার পানি ভেঙ্গে গেল এবং আমি অনুভব করলাম যে আমার বাচ্চা লক্ষ্যনীয়ভাবে নিচে নেমে এসেছে। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে বাচ্চা জন্ম না হওয়া পর্যন্ত আমার আর ঘরে ফেরা হচ্ছে না। কর্মচারীরা দ্রুত আমার বিছানার পাশে একটা গার্নি নিয়ে আসল এবং আমাকে তাতে উঠিয়ে দিল। তারা একটা ভারী কম্বল আমার দিকে ছুড়ে দিল আমার শালীনতা ঢাকতে এবং ডেলিভারি রুমের দিকে দ্রুত দৌড়ে চলল।

এই টেবিল ঝড়ের বেগে চলার মাঝেই আমি প্রসব করেছিলাম। তাই অবশেষে, আল্লাহ্‌ই উত্তম পরিকল্পনাকারী এবং আমার আর ঘরে প্রসব করা হয়নি, সুবহানআল্লাহ। কিন্তু আমি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে প্রসব করতে পেরেছিলাম যেহেতু হস্তক্ষেপ করার মতো সময় কেউ পায়নি। একই সাথে, যেহেতু এটা হাসপাতালে হয়েছিল তাই আমি সহজেই বাচ্চার জন্য কাগজপত্র তৈরি করতে পেরেছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ্‌।

 

আমানীর জন্ম …

আমার অষ্টম গর্ভাবস্থা আবিষ্কার করার ঠিক আগে, মধ্যপ্রাচ্যে ব্র্যাডলে মেথড® শেখানোর ডাকে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি অ্যাপ্লিকেশন জমা দিয়ে আমেরিকা যাওয়ার জন্য টিকেট বুক করলাম। তারা আমার অ্যাপ্লিকেশন গ্রহণ করতে সম্মত হওয়ার কিছুদিন পরেই বুঝতে পারলাম যে আমি আবার সন্তানসম্ভবা, আলহামদুলিল্লাহ্‌।

আমার স্বামী অবিশ্বাস্য রকম সহযোগী ছিলেন এবং উনাকে উচ্চস্বরে পড়ে আমার একাডেমিক পড়াশোনার কিছু অংশ শোনালে তিনি শুনতেন। তারচেয়েও বেশি যেটাতে আমি আনন্দের সাথে অবাক হয়েছিলাম সেটা হচ্ছে পনের বছর আগের আমার ব্র্যাডলে® শিক্ষক জ্যানেটের সাথে দেখা করতে উনি সম্মত হয়েছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ওয়ার্কশপে যোগ দেয়ার আগে সে আমাদের প্রশিক্ষণের জিনিসপত্র সম্পর্কে অল্প সময়ে একটা পূর্ব ধারণা দিতে চেয়েছিল। আমি শিহরিত হয়েছিলাম যখন আমার স্বামী এতে রাজি হয়েছিলেন এবং প্রার্থনা করেছিলেন এই অভিজ্ঞতা থেকে হয়ত তিনি কিছু শিখতে পারবেন।

শিক্ষকদের ওয়ার্কশপে যোগ দেয়ার সময় যখন আসল আমার স্বামী উভয়সঙ্কটে পড়ে  গেলেনঃ আমার সাথে ক্লাসে বসবেন নাকি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য সাতটা বাচ্চার সাথে হোটেলের রুমে থাকবেন। যেহেতু আরও একজন স্বামী উনার স্ত্রীর সাথে ক্লাসে বসতেন, আমার স্বামীও সিদ্ধান্ত নিলেন চেষ্টা করে দেখার। তিনি হয়ত পুরো প্রোগ্রামে মনোযোগ দিবেন না, কিন্তু যতটুকু সময়ই তাঁর থেকে পাওয়া যাবে তাই-ই অনেক এই ভেবে আমি রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।

আমার স্বামীর মাঝে যে বিরাট পরিবর্তন হবে সেটা আমি তখনও জানতাম না! সেই ওয়ার্কশপের কোর্স চলাকালীন উনার মাঝে এমন উপলব্ধি হয়েছিল যা উনার জীবন বদলে দিয়েছিল! অবশেষে উনি “বুঝতে পেরেছিলেন” যে পিতৃত্বের পথে যাত্রায় বীজ বপন করা ছাড়াও উনার একটা ভূমিকা আছে। গর্ভাবস্থা, প্রসব ও পরবর্তীতেও বাবার ভূমিকা নিয়ে উনি প্রবল অনুরাগী হয়ে ওঠেন। আমার ও সন্তানদের সাথে উনার সম্পর্কের পুরোটাই এমনভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল যা আমার পক্ষে ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব না। আমার মনে হচ্ছিল যেন আমি একজন সম্পূর্ণ নতুন স্বামী পেয়েছি, মাশাল্লাহ!

যখন আমাদের মেয়ের জন্মের সময় আসল, উনি সহযোগিতা ছাড়া ঘরে প্রসবের পূর্ণ সমর্থক ছিলেন। উনি শুধু এতে সমর্থনই দেননি, উনি এতে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসুক হয়ে ছিলেন। যেদিন ওর জন্ম হোল, আমার স্বামীই ওকে প্রথম ধরেছিলেন (আক্ষরিক অর্থেই), পুরো দৃশ্যপট পরিষ্কার করেছিলেন, এবং প্রচুর ছবি তুলেছিলেন। উনি এত্ত যত্নশীল ও মমতাময় ছিলেন, মাশাল্লাহ।

তিনি এই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা হৃদয়স্পর্শী লেখাও লিখেছিলেন, যা আমার সৌদি বার্থ স্টোরি ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে (বেবি নাম্বার এইট দিয়ে খোঁজ করুন)। এই অভিজ্ঞতার পর আমি আমার স্বামীর সাথে মানসিকভাবে আরও বেশি সংযুক্ত ও কাছের অনুভব করেছিলাম। আমাদের সব সন্তানদের সাথেও তিনি যেভাবে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন সেটা আমি সত্যিই শ্রদ্ধার চোখে দেখি, মাশাল্লাহ।

পরবর্তীতে আমি যখন দম্পতীদের শেখানো শুরু করলাম, আমি নিজের চোখের সামনে একই ধরণের পরিবর্তন ঘটতে দেখেছি, মাশাল্লাহ। ব্র্যাডলে মেথড® ফোকাস করে স্বামী যেন তার স্ত্রীর কোচ হয় এবং স্ত্রীর গর্ভাবস্থা, প্রসবব্যথা ও প্রসবের সময় তার পূর্ণ সেবা ও সহযোগিতাকে সত্যিই উৎসাহিত করে।

আমি সত্যিই মনে করি সন্তানপ্রত্যাশী বাবা-মা ও তাদের অনাগত সন্তানের জন্য প্রাকৃতিক প্রসব ও ব্র্যাডলে মেথড® এক উপহার। তবে, আমি শীঘ্রই বুঝতে পারলাম যে বহু নারীর কাছে আমি পৌঁছাতে পারব কিন্তু আমি যে বিশাল বৈশ্বিক বিস্তৃতির স্বপ্ন দেখি আমেরিকান সংস্থা সেটার জন্য প্রস্তুত না।

এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নতুন শাখায় বিভক্ত হয়ে আমার নিজের মতো করে সন্তানপ্রসবের উপর প্রস্তুতিমূলক বিষয়বস্তু তৈরি করব। আমি অন্যান্য সন্তানপ্রসব মেথডগুলো নিয়ে আরও জানতে শুরু করলাম এবং শীঘ্রই প্রাকৃতিক প্রসবের ধাঁধায় নতুন জিনিস ইংল্যান্ডের জ্যানেট বালাকাসের সক্রিয় প্রসব খুঁজে পেলাম। সেই সাথে এই প্রোগ্রামের সঙ্গে কুরআনের অলৌকিকতাকে বের করে আনার ও সাংস্কৃতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকেও বিবেচনা করার বিরাট প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম।

আমার নিজের সন্তানদের প্রসবের জন্য ও সন্তানপ্রসব প্রশিক্ষক ও দৌলা হিসাবে প্রশিক্ষণের জন্য আমেরিকান একাডেমী অফ হাসব্যান্ড কোচড চাইল্ডবার্থ® এবং ব্র্যাডলে মেথডের® ভূমিকার জন্য তাদের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করতে পারব না। তারা AMANI Birth (www.amanibirth.com)-এর জন্য আমাকে সত্যিই স্প্রিংবোর্ড দিয়েছে। আল্লাহ্‌ এই যাত্রায় বারাকাহ দিক এবং বহু নারীকে এই কাজ থেকে সেরাটা গ্রহণ করার তৌফিক দিক এবং তাদের যে কোন ক্ষতি থেকে সুরক্ষিত করুক। আমীন!

 

[আইশা আল হাজারের লেখা AMANI Birth বই থেকে উনার পথচলার অভিজ্ঞতাটি অনুবাদ করা হয়েছে।]