রক্তস্বল্পতা anemia pregnancy

মহিলাদের রক্তস্বল্পতার হার কি পুরুষের চাইতে বেশি?
হ্যা। সাধারণত মহিলাদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার পুরুষের চাইতে বেশি হয়।

কেন মহিলাদের রক্তস্বল্পতা বেশি হয়?
পুরুষদের যেসব রোগের কারণে রক্তস্বল্পতা হয় সেগুলোর সাথে সাথে কিছু অতিরিক্ত কারণ থাকে মহিলাদের রক্তস্বল্পতার। যেমনঃ মাসিকে অধিক রক্তপাত, পুষ্টিকর খাবার কম খাওয়া এবং ভুল ধরণের ডায়েট প্ল্যানের কারণে মহিলাদের রক্তস্বল্পতা বেশি হয়। গর্ভকালীন সময়ে জরায়ুতে বাচ্চার বেড়ে ওঠার সময় রক্তস্বল্পতা হয়। প্রসবকালে অধিক রক্তপাতের কারণে মহিলাদের রক্তস্বল্পতা হয়।

মহিলাদের বিভিন্ন অটোইমিউন ডিজিস বেশি হয়। যেমন বাত, এসএলই (SLE), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (RA)। এ জাতীয় রোগের সাথে সাথে রক্তস্বল্পতা হয়। জরায়ু ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সারের মত রোগ থেকে মহিলাদের রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

মহিলাদের রক্তস্বল্পতার সাধারণ লক্ষণগুলো কি?

  • ক্লান্তি, দূর্বলতা, অবসন্নতা, বুক ধড়ফর করা, বুকে চাপ শ্বাস কষ্ট, আগে যে কাজ খুব সহজেই করতে পারতেন সেই কাজ করতে গিয়ে হাফিয়ে ওঠা।
  • শরীর ফ্যাকাসে সাদাটে মলিন হয়ে যাওয়া, ঠোটের কোনায় জিহ্বায় ঘা হওয়া, চুল কমে যাওয়া, নখ ভংগুর আর সোজা হয়ে যাওয়া।
  • মানষিক অবসন্নতা, খিটখিটে মেজাজ, কিছু ভাল না লাগা হতে পারে রক্তস্বল্পতার লক্ষণ।

মাসিকের অনিয়ম থেকে কি রক্তস্বল্পতা হতে পারে?
অবশ্যই। এটি মহিলাদের ও কিশোরীদের রক্তস্বল্পতার প্রধান কারণ।

ম্যানোপস এর সাথে কি রক্তস্বল্পতার সম্পর্ক আছে?
অনেক সময় ম্যানোপজ পূর্ববর্তী অনিয়মিত মাসিকের সাথে অধিক রক্তপাত এর কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

রক্তস্বল্পতার কারণ কি ক্যান্সার হতে পারে?
হ্যা। বেশ কিছু ক্যান্সারের প্রথম সংকেত হতে পারে রক্তস্বল্পতা। বিশেষ করে রক্তক্যান্সারের সাথে রক্তস্বল্পতার নিবিড় সম্পর্ক আছে।

ক্যান্সার ছাড়া আর কি কি কঠিন রোগে রক্তস্বল্পতা হয়?
কিডনির রোগ, বিভিন্ন বাত, বিভিন্ন অটোইমিউন ডিসিস (SLE,RA), রক্ত ভেঙে যাওয়া যেমন ইমিউন হিমোলাইটিক এনিমিয়া, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনের সমস্যা, অন্ত্রে অপারেশন, এনোরেক্সিয়া নার্ভোসা বা কম খাওয়ার রোগ, অধিক গ্যাস্ট্রিক ও গ্যাস্ট্রিকের অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়া সহ বিভিন্ন জটিল এবং /অথবা দীর্ঘ মেয়াদি রোগের সাথে সাথে বা লক্ষণ হিসেবে বা ফলাফল হিসেবে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

ইনফার্টিলিটির সাথে কি রক্তস্বল্পতার সম্পর্ক আছে?
ইনফার্টিলিটির কিছু কারণ রক্তস্বল্পতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। ইনফার্টিলিটিতে ভোগা অনেকের রক্তস্বল্পতা থাকে। আবার কিছু রোগ যেগুলো ফার্টিলিটির সমস্যা করে সেগুলোতে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।

গর্ভধারণ এর সাথে কি রক্তস্বল্পতার সম্পর্ক আছে?
গর্ভকালে মহিলাদের রক্তস্বল্পতা বেশি হয়।

গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতায় কি ক্ষতি হয়?
রক্ত কম থাকলে মা ও শিশুর পুষ্টি কম হয়। প্রেগ্নেন্সির সময় , ডেলিভারির সময় নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। মা ও বাচ্চা উভয়ের মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়।

গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতায় শিশুর বৃদ্ধি কম হতে পারে?
হতে পারে। কারণ রক্তই মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার কাছে পুষ্টি পৌছে দেয়। তাই মায়ের রক্তস্বল্পতায় শিশু পুষ্টি কম পেতে পারে।

মায়ের রক্তস্বল্পতায় কি বাচ্চার বিকলাঙ্গতার কারণ হতে পারে?
কিছু কিছু রক্তস্বল্পতা সংশ্লিষ্ট রোগ সরাসরি বাচ্চার শরীর ও ব্রেইনের বৃদ্ধি ও বিকাশকে ব্যহত করে। অনেক সময় রক্তস্বল্পতার কিছু নির্দিষ্ট কারণের সাথে বাচ্চার নার্ভ বা স্নায়ুর বিকাশগত সমস্যা হতে পারে।

গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতা কি মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর কারণ হতে পারে?
অবশ্যই।

প্রেগ্নেন্সির বা বাচ্চা হওয়ার আগেই কি রক্তস্বল্পতা আছে কিনা দেখে নেওয়া উচিত?
অবশ্যই। গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতার কারণে মা ও শিশুর অনেক ক্ষতি হতে পারে। তাই আগে থেকেই কোন সমস্যা আছে কিনা দেখে প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়া উচিৎ। মনে রাখতে হবে prevention is better than cure.

মায়ের রক্তস্বল্পতার জন্য শিশুর যেসব বিকলাঙ্গতা হয় সেগুলোকি প্রতিরোধ যোগ্য?
হ্যা। বিশেষ করে বাচ্চা নেওয়ার আগে থেকেই রক্তস্বল্পতা ও এর কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা নিলে এসব সমস্যা অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায় ইনশা আল্লহ।

মায়ের রক্তস্বল্পতার সাথে কি গর্ভপাতের সমস্যা হতে পারে?
মায়ের রক্তস্বল্পতা মায়ের গর্ভে একটি নতুন দেহ বেড়ে ওঠার চাপ সহ্য করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আবার বাচ্চারও পূর্ণ বিকাশে বাঁধা দেয়। অনেক সময় বাচ্চার বিকলাঙ্গতাও করতে পারে। রক্ত স্বল্পতাজনিত শারীরিক চাপ সহ্য করার অক্ষমতা এবং রক্তস্বল্পতার কারণের উপর নির্ভর করে জরায়ুতে সমস্যা বা বিভিন্ন অটোইমিউন সমস্যা থাকতে পারে। তাই সবকিছু মিলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে।

মায়ের রক্তস্বল্পতা কি শিশুর মধ্যে চলে যেতে পারে?
বংশগত রক্তস্বল্পতা ( থ্যালাসেমিয়া, হিমোগ্লোবিন ই) মা থেকে শিশুতে যেতে পারে। গর্ভকালীন রক্তস্বল্পতায় শিশুর বিকাশ কম হতে পারে ও পরিপূর্ণ পুষ্টি না পেয়ে শিশুর রক্তস্বল্পতা করতে পারে। মায়ের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসায় মাকে অপ্রয়োজনীয় রক্তস্বঞ্চালন দেওয়ার কারণে মায়ের গর্ভের শিশুর নিজে নিজে রক্ত তৈরির ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

মায়ের থ্যালাসেমিয়া ব্যতিত অন্য রক্তস্বল্পতা থাকলে শিশুর কি সমস্যা হতে পারে?
রক্তস্বল্পতার কারণের উপর নির্ভর করে থ্যালাসেমিয়া ব্যতিত অন্য রক্তস্বল্পতায় শিশুর অপুষ্টতা ওজন কম ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। কিছু কিছু রক্তস্বল্পতার কারণের সাথে গর্ভের শিশুর বিভিন্ন বিকলাঙ্গতা ও ব্রেইন ডেভলপমেন্ট এর অভাব এর সম্পর্ক আছে।

প্রেগনেন্সিতে রক্তস্বল্পতার ওষুধ কি কোন সমস্যা করে?
হ্যা কিছু ক্ষেত্রে করতে পারে। তবে এটা বিভিন্ন অবস্থার উপর নির্ভর করে। খুব সাবধানে সম্মানিত চিকিৎসক এর পরামর্শ ছাড়া প্রেগ্নেন্সিতে কোন ওষুধ খাওয়া উচিৎ নয়। এ কথা রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিছু রক্তস্বল্পতার ওষুধ শিশুর বিকলাঙ্গতাও করতে পারে।

মহিলাদের / গর্ভবতী মায়েদের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা মানেই কি শরীরে রক্ত নেওয়া?
না। মহিলা পুরুষ শিশু গর্ভবতী কারও জন্যই রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা মানেই রক্ত নেওয়া নয়। রক্ত কখনোই রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা নয়। রক্তস্বল্পতার কারণ নির্ণয় না করে রক্ত দেওয়া একটি অপরাধ। এতে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

মহিলাদের রক্ত নিলে কি আলাদা কোন সমস্যা হয়?
এমনিতেই শরীরে বাইরে থেকে রক্ত দিলে মহিলা পুরুষ উভয়েরই বিভিন্ন রিয়েকশন ও অসুবিধা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আলাদা করে মহিলাদের ক্ষেত্রে শরীরে বিভিন্ন এন্টিবডি তৈরি হতে পারে যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তীতে গর্ভের শিশুর জন্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

গর্ভাবস্থায় রক্ত নিলে কি আলাদা কোন সমস্যা হয়?
রক্তসঞ্চালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে কিছু প্বার্শপ্রতিকৃয়া বা রিয়েকশন হয় যা গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। অনেক সময় রক্তের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ হয় যা শিশুকে সংক্রমিত করতে পারে। মায়ের শরীরে বিভিন্ন এন্টিবডি তৈরি হয়ে বর্তমান বা পরবর্তী গর্ভাবস্থায় সমস্যা হতে পারে।

তাহলে মহিলাদের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা কি?
মহিলা পুরুষ সকলের রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা হল রক্তস্বল্পতার যথাযথ কারণ নির্ণয় ও সেই কারণের চিকিৎসা এবং যতটুকু সম্ভব বাইরে থেকে রক্ত না দিয়ে কেবল মাত্র খাবার ও ওষুধের মাধ্যমেই রক্তবাড়ানোর চেষ্টা করা।

রক্ত অনেক কম থাকলেও কি রক্ত না দিয়ে কাজ হয়?
হ্যা। এটা কারণের এবং রোগীর লক্ষণের উপর নির্ভর করে। আমি হিমোগ্লোবিন তিন পর্যন্ত রক্ত না দিয়ে সাফল্যের সাথে চিকিৎসা করেছি। (এটা সম্মানিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞগণ এর কাজ। নিজে নিজে আবার ডাক্তারি শুরু করবেন না।)

রক্তস্বল্পতা রিপোর্টে কিভাবে বুঝব?
মহিলাদের ক্ষেত্রে রক্তের CBC রিপোর্টে হিমোগ্লোবিন / Hb ১২ এর কম হলে এবং/অথবা এমসিভি/MCV ৮৩ এর কম হলে রক্তস্বল্পতা চিন্তা করতে হবে।

রক্তস্বল্পতা হয়েই গেলে কি করব?
আপনি একজন সম্মানিত রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করবেন। উনি আপনার রক্তস্বল্পতার মান,মাত্রা, কারণ নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন এবং সে অনুযায়ী যথাসম্ভব শরীরে বাইরে থেকে রক্ত না দিয়ে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করবেন ইনশা আল্লাহ।

ডা মু জামাল উদ্দিন তানিন
রক্তরোগ ও রক্তক্যান্সার বিশেষজ্ঞ,
কনসাল্টেন্ট, পার্কভিউ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।