এপিসিওটমি কি?

স্বাভাবিক প্রসব চলাকালে চিকিৎসকেরা অনেক সময় যোনিপথ ও পায়ুপথের মাঝখানে (আনুমানিক ১-১.৫ ইঞ্চি আড়াআড়ি) একটু কেটে প্রসবের পথ প্রসারিত করে দেন। এই পদ্ধতির নাম এপিসিওটমি।

সাধারণত ‘সার্জিকাল’ কাঁচি দিয়ে এক থেকে দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত কাটা হয়ে থাকে। কাটার আগে জায়গাটি অবশ করার জন্য ইনজেকশন দেয়া হয়।

history of episiotomy এপিসিওটমির একাল সেকাল
এপিসিওটমির একাল সেকাল

কিভাবে কোথায় শুরু হলো এপিসিওটমি?

১৭৪০ এর দশকে প্রসবের সময় যখন নাপিত-সার্জনরা অংশগ্রহণ করতে শুরু করেছিলেন সেই সময়ে ইউরোপে প্রথম এপিসিওটমি ব্যবহার করা শুরু হয় এবং ১৯২০ এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ড. জোসেফ ডিলি, শিকাগো লাইং-ইন হাসপাতালের একজন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এটা প্রচলিত করেন। তিনি প্রসবের গতি বাড়াতে এবং ট্রমা কমাতে রুটিন এপিসিওটমি প্রস্তাব করেছিলেন এবং তখনকার ধারণা অনুযায়ী যোনিপথ স্বাভাবিক ভাবেই আগের অবস্থায় ফিরে আসবে ধরে নেয়া হতো।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশকে যখন বাড়িতে প্রসব করার চেয়ে হাসপাতালে প্রসব করাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া শুরু হয়, তখন বিভিন্য অস্ত্রোপচার পদ্ধতি এবং এপিসিওটমি রুটিন হয়ে ওঠে। খুব দ্রুত এর হার বেড়ে যায়। প্রথম বা তার বেশি সকল স্বাভাবিক প্রসবের মধ্যে এপিসিওটমির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ শতাংশে এবং প্রথম মায়েদের মধ্যে এই হার বেড়ে হয় ৮০ শতাংশ।

ধীরে ধীরে হলেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ১৯৮৩ সালে এপিসিওটমি এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে ভালোভাবে লেখালেখি হয়, একটি প্রমাণ এবং তথ্যবহুল লেখা প্রকাশিত হয়। যেটা ১৯৮৫ সালের ডব্লিউ এইচ ও সম্মেলনে পর্যালোচনা করে এই নির্ণয়ে আসে যে রুটিনমাফিক এপিসিওটমি বন্ধ করতে হবে, পেরিনিয়াম অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য যা যা পদ্ধতি গ্রহণ করা যায় করতে হবে।

কিন্তু ততোদিনে এপিসিওটমি প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়। এখানে ডঃ মারসডেন ওয়েগনার এর একটি অভিজ্ঞতা আমি আপনাদের জানাতে চাই। ১৯৯০ এর দশকে তিনি একটি বড় হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে একজন ইন্টার্ন এর ব্যপারে জানতে পারেন যে সে এক মাকে সন্তান প্রসব পরবর্তীকালে এপিসিওটমি দিয়েছে। কিন্তু কেন? কারণ তাকে বলা হয়েছে যে এই কাজটা সব প্রসবের একটা অংশ, কিন্তু প্রসবের আগে এপিসিওটমি দেয়ার সুযোগ না পাওয়ায় প্রসবের পরে রুটিনমাফিক এই কাজ সম্পন্ন করেছিল সেই ইন্টার্ন।

১৯৯৫ সালে কোক্রেইন লাইব্রেরির করা এপিসিওটমির উপর উল্লেখযোগ্য একটি রিসার্চে বলা হয় এই রুটিনমাফিক কাটার কারনে প্রসবকালীন ট্রমা এবং জটিলতা বৃদ্ধি পায়। এরপরই কিছু কিছু হাসপাতালে এপিসিওটমির মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। কোন জায়গায় এটা কমে ৮০ ভাগ থেকে ১০ ভাগে নেমে আসে। পেরিনিয়াম অঞ্চলে ৩য় ও ৪র্থ মাত্রার ছিঁড়ে যাওয়া কমে নামে অর্ধেকে। কোন সাইড কাটা বা ছিঁড়ে যাওয়া ছাড়া প্রসব করতে পারা মায়েদের সংখ্যা ৩ গুন বেড়ে যায়।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

আরেক গবেষণায় পাওয়া যায় যে এপিসিওটমি সমর্থক প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের মতে যেই তিনটি সুবিধার কথা মাথায় রেখে এই চর্চাটা চলে আসছিল সেগুলো আদতেও সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত না। সেই তিনটি ধারণা হলো – ৩য় মাত্রার খারাপ ভাবে ছিঁড়ে যাওয়া প্রতিরোধ করা, পেলভিক ফ্লোরের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি প্রতিরোধ করা, দীর্ঘ প্রসববেদনার ফলে বাচ্চাকে ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা।

এপিসিওটমির ফলে কি হয়? আমরা জানি যে কোন কাপড় কাটার জন্য দোকানিরা কাপড়ের উপর একটু করে কেটে পুরোটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। এপিসিওটমি ঠিক সেভাবেই পরবর্তিতে ৩য় বা ৪র্থ মাত্রার ছিঁড়ে যাওয়ার ঝুকিতে ফেলে দেয়। কারণ এপিসিওটমি কোন কোষ নির্বিশেষে দেয়া হয়। এতে টিস্যুগুলোর মধ্যে ফাটল তৈরি হয় যা পরবর্তীতে বাচ্চা বের হওয়ার সময় আরো বেড়ে যেতে পারে। 

এপিসিওটমির রকমফের

এখন একটু জেনে নিই যোনিপথের ছিঁড়ে যাওয়াটা কি এবং কত রকমের হতে পারে

প্রসবের সময় যোনিপথ ছিঁড়ে যেতে পারে। এটিকে পেরিনিয়াল লেসারেশনও বলা হয়, এতে মায়ের যোনি এবং পেরিনিয়ামের চারপাশে টিস্যুতে (ত্বক এবং পেশী) ছিঁড়ে যাওয়া। পেরিনিয়াল এলাকা (পেরিনিয়ামও বলা হয়) হল যোনিপথ এবং আপনার মলদ্বারের মধ্যবর্তী স্থান।

একটি সাধারণ যোনিপথের প্রসবের সময়, মায়ের যোনির ত্বক পাতলা হয়ে প্রসবের জন্য প্রস্তুত হয় যাতে শিশুর মাথা এবং শরীর আঘাত ছাড়াই মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসতে পারে। এই সময় এই জায়গা ছিঁড়ে যেতে পারে। কি কি কারণে ছিঁড়ে যায়?

  • বাচ্চার ওজন বেশি হয়ে গেলে।
  • প্রসব খুব দ্রুত হলে (ত্বক প্রসারিত এবং পাতলা হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় না পেলে)
  • প্রসবের সময় ফোর্সেপ ব্যবহার করা হলে।

যোনিপথের ছিঁড়ে যাওয়া কত গুরুতর হতে পারে?

যোনিপথের ছিঁড়ে যাওয়া বিভিন্ন শ্রেণীর হয়। এই শ্রেণীগুলি ছিঁড়ে যাওয়ার তীব্রতার দ্বারা নির্ধারিত হয়।

প্রথম-ডিগ্রি টিয়ার: এটি সবচেয়ে কম গুরুতর, এতে যোনি এবং পেরিনিয়াল এলাকার চারপাশে টিস্যুর প্রথম স্তর ছিঁড়ে যায়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সেলাই লাগেনা।

দ্বিতীয়-ডিগ্রি টিয়ার: প্রসবের সময় এই মাত্রার ছিঁড়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এটা কিছুটা বড় হয়, ত্বকের মধ্য দিয়ে যোনি এবং পেরিনিয়ামের পেশীবহুল টিস্যুর গভীর পর্যন্ত ছিঁড়ে যায়।

তৃতীয়-ডিগ্রি টিয়ার: তৃতীয়-ডিগ্রি টিয়ার যোনি থেকে মলদ্বার পর্যন্ত প্রসারিত হয়। এই ধরনের টিয়ারে ত্বক এবং পেরিনিয়াল এলাকার পেশীর টিস্যুতে আঘাতের পাশাপাশি পায়ূ পেশীগুলিরও ক্ষতি হয়। যেই পেশীগুলি অন্ত্রের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে। এপিসিওটমি দেয়া হলেও তৃতীয় ডিগ্রি টিয়ার হতে পারে।

চতুর্থ-ডিগ্রি টিয়ার: এটা সাধারণত হতে দেখা যায়না বিশেষ কিছু ঘটনা ছাড়া। এক্ষেত্রে তৃতীয় ডিগ্রি টিয়ারের সাথে আর গভীরভাবে ছিঁড়ে মলদ্বার পর্যন্ত চলে যায়। এপিসিওটমি দেয়া হলেও চতুর্থ ডিগ্রি টিয়ার হতে পারে।

প্রসবের সময় স্বাভাবিক টিয়ারে আঁকাবাঁকা ভাবে শুধুমাত্র টিস্যুগুলো ছিড়ে যায়, কিন্তু কোষ অক্ষত থাকে এবং কোন সেলাই ছাড়ায় সেরে যায়। কিন্তু সাইড কেটে দেয়া হলে টিস্যুগুলো নিজস্ব নিয়মে ছিড়েনা, বড়ং কোষ কেটে যায়, শারীরবৃত্তীয় কাঠামো মানেনা যার ফলে বেশি রক্তক্ষরণ, বেশি ব্যথা হয়। পেশীও আগের মতো থাকেনা। এটা ২য়, ৩য় বা ৪র্থ ডিগ্রি টিয়ার হয়ে যেতে পারে এবং সেরে উঠতে কমপক্ষে ৭ দিন থেকে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। সহবাসের সময় ব্যথা অনুভব হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে ৫৩ শতাংশ পর্যন্ত। অন্ত্রের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশে এপিসিওটমি

বাংলাদেশে এপিসিওটমির একটা চিত্র আমরা দেখতে পারিঃ

২০১৭ সালে জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাঙ্গামাটিতে একটি জরিপ করা হয়। ৪৩৩ জন মা স্বাভাবিক প্রসব করে। যাদের মধ্যে প্রথমবার মা হন ২৩১ জন, দ্বিতীয় বা তার অধিকবার মা হন ২০২ জন। এপিসিওটমি দেয়া হয় মোট ১৫৬ জন মাকে। এই ১৫৬ জনের মধ্যে প্রথমবার মা ছিলেন ১০৯ জন, দ্বিতীয় বা তার অধিকবার মা ছিলেন ৪৯ জন। উপসংহার এই যে রাঙ্গামাটিতে এপিসিওটমির হার অনেক বেশি।

এপিসিওটমি এড়াতে কি কি করা যায়?

একজন মা পেরিনিয়ামের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন এবং এপিসিওটমির প্রয়োজনীয়তা কমাতে পারেন এইভাবে-

  • একজন দৌলাকে প্রসবের সময় সাথে রাখা। একজন দৌলা জানবে মা প্রসবের সময় কি কি চাচ্ছে, কিভাবে চাচ্ছে। সে ডাক্তারকে মায়ের পরিকল্পনা জানাবে এবং সেইভাবে প্রসবের জন্য উৎসাহিত করবে।
  • গর্ভাবস্থার শেষ কয়েক সপ্তাহে পেরিনিয়াল ম্যাসেজ।
  • শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম।
  • কেগেল ব্যায়াম।
  • এছাড়াও প্রসবের বিভিন্ন অবস্থান সাহায্য করে।

বিভিন্নভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে রুটিনমাফিক সাইড কাটা সাক্ষ্য প্রমাণ এবং গবেষণার ভিত্তিতে না বরং  প্রসূতি বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ সময় ধরে করে আসা এক ভুল চর্চা। প্রাকৃতিক প্রসবে শতকরা ৫০ ভাগ মায়েদেরই পেরিনিয়াম অক্ষত থাকে, কোন টিয়ার ছাড়াই প্রসব হয়ে যায়। কিন্তু সাইড কাটা হলে শতকরা ১০০ ভাগ মায়েরদেরই কমপক্ষে ২য় ডিগ্রি টিয়ার হয়ে যায়। সব মায়েদের এই ব্যপারে জানা উচিৎ যাতে তারা তাদের ডাক্তারদের সাথে এই ব্যপারে প্রসবের আগেই কথা বলে নিতে পারে।

এপিসিওটমির স্বাভাবিক হার ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিৎ না। এটা তখন করা যাবে যখন আসলেই এর প্রয়োজন।

তথ্য উৎস

১. Born in the USA: How a Broken Maternity System Must Be Fixed to Put Women and Children First by Marsden Wagner
২. Routine Episiotomy Practice : A Study from Bangladesh
৩. Prediction of Perineal Tear During Childbirth by the Assessment of Striae Gravidarum Score

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ সাবরিনা আফরোজ
এমবিবিএস, এমপিএইচ
লেকচারার, ঢাকা কমিউনিটি মেডিসিন কলেজ

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা