পোষ্টপার্টাম কেয়ারগিভারের রোল কেমন হবে, সেটার উপর একটা ক্লাস করছিলাম। পোষ্টপার্টাম টাইমটা সাধারনত ৪০ দিন। আবার ৪০ দিন থেকে এক বছর সময় পর্যন্ত হতে পারে। ইন্সট্রাকটর বারবার এই সময়কে স্যাক্রেড টাইম বলছিল। এই সময় একটা মা কে রানীর মতো ট্রিট করা উচিত। তাকে প্রসবের জন্য রেসপেক্ট করা উচিত। প্যাম্পার করা উচিত। ভালোবাসা উচিত। তাকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। ঠিক কি রকম বৈষয়িক সেবা একজন মা পাবে, তার মধ্যে আছে তাকে বিশ্রামের সুযোগ দেয়া, তার জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, তার জন্য স্পেশাল স্পা’র ব্যবস্থা করা, এমনকি তার জন্য স্পেশাল পোষ্টপার্টাম পার্টি দেয়া! তার শারীরিক- মানসিক হিলিং এ সাহায্য করা। মোটকথা একজন রানীকে যেরকম ট্রিট করা হয়, নতুন মাকে সেভাবে স্বাগত জানানো।

postpartum care 4th trimester

ওয়েস্টের ইন্ডিভিজুয়ালিষ্টিক সোসাইটির তুলনায় কালেক্টিভিষ্ট সোসাইটিতে এখনো প্রসব পরবর্তি মা কে এইধরনের কিছু সেবা দেয়া হয়।কোন কোন দেশে এই সেবার প্রচলন আছে, তার তালিকায় বাংলাদেশও আছে দেখলাম। আমাদের দেশে এখনো ডেলিভারীর সময় মা, বোন, খালা, ফ্রেন্ড, কোনা না কোন ক্লোজ রিলেটিভ মায়ের কাছাকাছি থাকে। মাকে সাপোর্ট দেয়ার চেষ্টা করে।

আমি চিন্তা করছিলাম একজন নতুন মা আসলে কেমন সাপোর্ট পান? অনেক ক্ষেত্রেই এরকম সাহায্যকারী থাকলে তাকে হয়ত ডেলিভারির পর বাসায় ফিরেই রাঁধতে হয় না। বাচ্চাকে আদর করার জন্য হলেও কেউ না কোলে নেন। আর কি? লিস্ট খুব একটা চেষ্টা চরিত্র করেও বড় করতে পারছিলাম না। কারন বেশির ভাগ ফ্যামিলিতে এর পরই শুরু হয়েছে মাতৃত্বের পোষ্টমর্টাম। বাচ্চা কাঁদে কেন? নিশ্চয়ই দুধ পায় না। বাচ্চা ঘুমায় না কেন? মা ঘুম পাড়াতে পারে না। বাচ্চার মুখে র‍্যাশ কেন? মা যত্ন নেয় না। একটা দুইটা বাচ্চা পালতে পারে না? বাচ্চার সাথে সাথে সদ্য জন্ম নেয়া মা যে কত খারাপ একটা মা সেটা পারলে সার্টিফিকেট করে বাঁধাই করে রাখে। কি আশ্চর্য, পুরনো মা রা যারা এই প্রসেসের ভেতরে দিয়ে যান, তারাও সব ভুলে নতুন মা কে পারলে তুলাধুনা করেন।

পোষ্টপার্টাম টাইমটাকে ফোর্থ ট্রাইমিষ্টার বলে আখ্যায়িত করা হয়। প্রেগন্যান্সিতে যেমন হরমোনের আপ-ডাউন থাকে, এই সময়টাতেও তাই। ডেলিভারিতে এমনিতেই যে শারীরিক ধকল যায়, তার পাশাপাশি মানসিক টানাপোড়নে এই সময় খুব খুব সেন্সেটিভ। বেবি ব্লু, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন, সাইকোসিস এগুলা খুব অস্বাভাবিক না। বাচ্চার খাবারের যোগান আসে মায়ের কাছ থেকে। রাতে ঘুম হয় না ঠিকমতো। বাইরে কি দিন না নাকি রাতে সেটা বুঝতেও সময় লেগে যায়। এসময় শরীর তো বটেই মনের যত্ন খুব দরকার। কয়টা মানুষ সেটা বুঝে! কিভাবে কোনদিকে দোষ ধরে মা কে নাকাল করা যায়, দিনরাত যেন সেই চিন্তায় আছে মানুষ। রেস্ট কি, আর মনের যত্নই বা কি।

আমি আমার নিজের কথা ভাবছিলাম। দুই বাচ্চার সময় কোন বারই বাচ্চাদের বাবা ছাড়া আর কেউ ছিল না। রান্নার কথা চিন্তা করলে, দুইবারই আশেপাশের পরিচিত- স্বল্প পরিচিত প্রচুর লোক খাবার পাঠিয়েছে। নিচতলায় থাকা, হাঁটার সময় শব্দ হয় বলে, খালি কমপ্লেইন করা আলজেরিয়ান প্রতিবেশী একবার ধোঁয়াউঠা গরম স্যুপ আর হাতে বানানো রুটি নিয়ে এসেছিলো। খাবার নিয়ে চিন্তা হয় নি।

ফোনে কিংবা সামনা সামনি সবাই জিজ্ঞেস করোতো ফিজিক্যালি ভালো আছি কিনা। মন খারাপ লাগলে এসো- বলেছিল একজন। কিন্তু কখনো কেউ জানতে চায় আসলে কেমন আছি। একবার একটা কাজে ব্যাংকে গেছিলাম। ক্যাশিয়ার মেয়েটা সাথের কারসীটে বাচ্চা দেখে নরম গলায় জিজ্ঞাস করেছিলো, রাতে ঘুমাতে পারো? চোখে পানি চলে আসছিলো। বিলিভ মি, যত শারীরিক ধকল যাক, মায়েরা একটু মেন্টাল সাপোর্ট চায়। আমাদের দেশের লোকজন যতটা না শারীরিক সাপোর্ট কে সাপোর্ট দেয়া মনে করে, মানসিক সাপোর্টকে তার সিকিভাগও না।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

নানান কারনে আমার নিজের পোষ্টপার্টাম খুব সেন্সেটিভ ছিল। শরীর ছাড়াও মনের দিকে দিয়ে সেরে উঠতে স্বাভাবিকের চাইতেও বেশি সময় লেগেছিল। তখন থেকেই মনে হতো, কিভাবে আরেকজন মা কে সাহায্য করা যায়। আমরা কেন জানি মা কে মা হয়ে উঠার জন্য সময় দেই না। শুরু থেকেই দম দেয়া পুতুল মনে করি। আল্লাহ্‌ যেখানে কুরআনে মায়ের কষ্টকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, আমাদের দিতে খুব কষ্ট। নতুন মা কে পারলে রানীর মতো ট্রিট করেন। না পারলে এট লিস্ট তাকে শরীরের সাথেসাথে মনের দিকে থেকে হিল হতে সুযোগ দেন। আপনার দেয়া এই সময়ের সাপোর্ট তার মাতৃত্বকে সহজ করবে।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা