পটি ট্রেনিং এর রূপক ছবি

বেশির ভাগ মায়েদের কাছেই পটি ট্রেনিং একটি বিভীষিকার নাম! বিষয়টি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু খুব কঠিন কোন ব্যাপার নয় যদি সঠিক বয়সে, সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।

কখন থেকে ভাবা উচিত

সন্তানের বয়স এক বছর হতে না হতেই মায়েদের চিন্তা শুরু হয়ে যায় পটি ট্রেনিং নিয়ে। যদিও বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী এর আদর্শ বয়স ১৮ মাস থেকে শুরু করে ২০-৩০ মাস পর্যন্ত। ক্ষেত্র বিশেষে আবার তা চার বছর পর্যন্তও হতে পারে। 

সাধারণত পটি ট্রেনিং এর ক্ষেত্রে মেয়ে শিশুরা এগিয়ে থাকে, তাদের শেখার গতি ছেলেদের থেকে বেশি। আবার, ডায়পার কালচার খুব বেশি জনপ্রিয় না হওয়ার কারণে আমাদের এই উপমহাদেশের শিশুরা পটিতে বসতে পারে জলদিই। তবে মনে রাখতে হবে, একেক শিশু একেক রকম হয়, কোন কিছু রপ্ত করার ক্ষেত্রেও থাকে ভিন্নতা। তাই অন্য কারো কথা শুনে নিজের সন্তানকে জোড় করে সময়ের আগেই পটি ট্রেনিং দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

বয়সের সাথে কিন্তু আরো কিছু বিষয় লক্ষ্য করতে হবে, সেগুলো হল-

• সন্তান ঠিকমতো হাঁটতে/দৌঁড়াতে পারে কিনা

• ‎কোন কিছু নিয়ে ৫-১০ মিনিট একটানা বসে সময় কাটাতে পারে কিনা

• ‎নিজে নিজে প্যান্ট খুলতে পারে কিনা বা মাকে এ কাজে সহযোগিতা করতে চায় কিনা

• ‎ভিজা প্যান্টে অস্বস্তি বোধ করে কিনা

• হিসু ঠিকমত করছে কিনা, নাকি অল্প অল্প করে বারবার করছে

• টয়লেট লাগলে তা মাকে ঠিক ঠিক জানাতে পারে কিনা

• ‎ঘুমালে অন্তত দুঘন্টা ডায়পার শুকনা থাকে কিনা

• ‎কিছু নির্দেশ দিলে তা পালন করার চেষ্টা করে কিনা

প্রথমেই এই পয়েন্টগুলি দিয়ে একটা চেকলিস্ট তৈরি করুন। তারপর দেখুন আপনার সন্তান প্রস্তুত কিনা। হলে, আপনিও প্রস্তুত হয়ে যান পটি ট্রেনিং দেয়ার জন্য। আর কেউ যদি একদমই ডায়াপার ব্যবহার  করবেন না আগে থেকেই জেনে থাকেন তাহলে বাচ্চাকে পটিতে বসানোর অভ্যাস করবেন ৬/৭ মাস বয়স থেকেই (অবশ্যই বাচ্চাকে বসিয়ে দিলে বসে থাকতে পারে এবং ঘাড়ের উপর কন্ট্রোল  – এই দক্ষতা বাচ্চার থাকতে হবে)। ৮/৯ মাসে পটিতে বসাতে চাইলে বাচ্চারা সাধারণত বসতে চায় না। এই বয়সী বাচ্চার তাহলে পটিতে বসাটা না অভ্যাস হল, না তাকে পটিতে বসা কী সেটা বুঝানো গেল। কারণ ২ বা তার উর্ধ্বে বাচ্চাদের বুঝানো সম্ভব কিন্তু তার আগে বাচ্চার পটি ট্রেইনিং বুঝার মত জ্ঞান ডেভেলপ করে না৷  তাই অকারণ জোর প্রদান করা যাবে না৷    

পূর্বপ্রস্তুতি

পটি ট্রেনিং শুরুর আগে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কি করে ট্রেনিং দিবেন, টয়লেট এ নিয়ে যাবেন নাকি পটি দিয়ে শুরু করবেন। টয়লেটে করালে আপনাকে কমোডের উপর বসানোর জন্য ছোট সিট কিনতে হবে। তবে একদম শুরুতে পটিতে বসিয়ে শেখানোই শ্রেয়। সেক্ষেত্রে ভালো দেখে একটি বা দুটি পটি কিনে রাখুন।

পটি কেনার সময় কিন্তু মাথায় রাখতে হবে বেশ কিছু জিনিস-

১. পটির ধারণ ক্ষমতা যেন যথেষ্ট হয়, নাহলে টয়লেট ওর গায়ে লেগে যাবে। আবার এতোটাও বেশি দরকার নেই যার কারণে পটি অনেক উঁচু হয়ে যাবে। অনেক সময়েই পটি বেশি বড় হলে বাচ্চারা সেখানে বসতে ভয় পায়।

২. পটিতে যেন চেপে বসতে না হয় কিংবা বেশি প্রশস্ত না হয় সিট। তাহলে সেখানে পরে আর বসার আগ্রহ পাবে না।

৩. সহজে বহন ও ক্লিন করা যায় এমন পটি কিনুন। 

৪. ফিনিশিং দেখে কিনবেন। অনেক সময় পটিতে চোখা বা ভাঙা অংশ থাকতে পারে। আবার বেশি বাহারি পটির গায়ে চোখা কোন ডিজাইন থাকতে পারে।

৫. সম্ভব হলে কেনার সময় আপনার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কিনুন। পটি তার পছন্দমত হলে তাকে ট্রেনিং দেয়া সহজ হয়ে যাবে।

শুরু করুন ট্রেনিং 

আমাদের দেশের মুরুব্বি থেকে শুরু করে পশ্চিমা শিশু বিশেষজ্ঞরা সকলেই মনে করেন যে পটি ট্রেনিং এর স্টেপ ওয়ান হল তাদের ডায়াপার থেকে দূরে রাখা (ঘুমের সময় ছাড়া)। এর পর থেকে কিন্তু ওকে নির্দিষ্ট বিরতীতে পটিতে নিয়ে যেতে হবে। অনেক সময় সারাদিন ডায়াপারে থাকা বাচ্চা শুরুতে ডায়াপার ছাড়া পটি ব্যবহার করতে চায় না। অনেক বাচ্চা ডায়াপারেই টয়লেট করতে চায়, অন্য কোথাও না৷ সেক্ষেত্রে শুরুতেই হুট করে ডায়াপার বন্ধ করা উচিত নয়৷ দিনের কোন একটা সময় ৩-৪ ঘন্টার জন্য ডায়াপার না দিয়ে ঐ সময়টা তাকে নির্দিষ্ট সময় পর পর পটিতে বসাতে হবে বা টয়লেটে নিয়ে যেতে হবে। মনে রাখবেন এটা ধাপে ধাপে হবে, ধৈর্য ধরে লেগে থাকতে হবে। 

চেষ্টা করবেন প্রথম ট্রেনিং সেশনের জন্য এক কিংবা দুই দিন নির্ধারণ করতে, ছুটির দিন হলে ভালো। এই দুইদিন ওকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পটিতে বসান। অন্তত দশ সেকেন্ড বসিয়ে রাখুন। এই নির্দিষ্ট সময় বাচ্চা ভেদে ভিন্ন।  কিছু বাচ্চা প্রতি ৪০ মিনিটে পস্রাব করে, কিছু বাচ্চা ১ বা ১.৩০ ঘন্টা বিরতিতে। এই ধরন কিছুদিন খেয়াল করতে হবে। এভাবে আস্তে আস্তে ডায়াপার বন্ধের সময়সীমা  বাড়াতে হবে আর একই সাথে বাচ্চাকে বুঝাতে হবে। 

দেশীয় মা বা যারা বাচ্চাদের ডায়াপার দেন না তারা যে সমস্যার মুখোমুখি হন তা হল বাচ্চা হেটে হেটে সারা ঘরে টয়লেট করে বা টয়লেট করেই তা হাতে পায়ে লাগিয়ে ফেলে৷  এক্ষেত্রে বাচ্চা দিনের কোন সময়টা টয়লেট করছে সেটা লক্ষ্য করে সেই সময়ে বাচ্চাকে খেয়াল করতে হবে৷                

একেক শিশু একেক ভাবে মনের ভাব প্রকাশ করে। কোন শব্দ দিয়ে সে টয়লেটকে ইঙ্গিত করে তা আপনি সহ বাসার সবাইকে জানতে হবে। কিছু বাচ্চা টয়লেটের বেগ আসলে লুকোতে চায়,  বারান্দায় বা এক কোণে চলে যায়, কেউ নাক ফুলায় কেউ বা হঠাৎ খুব সাইলেন্ট মুডে চলে যায়৷ এসব খেয়াল করে তাকে পটিতে বসাতে হবে ঐ সময়ে৷ কেউ কেউ আবার কিছুই বলে না, কিন্তু একদম চুপ হয়ে যায় টয়লেটের বেগ চাপলে। এরকম হলে প্রায় প্রায়ই তাকে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

প্রথম প্রথম ভালোই ঝক্কি পোহাতে হবে সন্দেহ নেই। টুকটাক ‘এক্সিডেন্ট’ ঘটাও অস্বাভাবিক না! সেক্ষেত্রে বিরক্তি প্রকাশ না করে বলুন, “ইশ, একটুর জন্য মিস হয়ে গেল! এর পরের বার পটিতেই হবে ইন শা আল্লাহ।” মনে রাখতে হবে, শিশুদের বকা বা জোরাজুরি করার চেয়ে একটু উৎসাহ প্রদান অনেক বেশি কার্যকর। 

ট্রেনিং পিরিয়ড সবার জন্য সমান না। কারো কারো ক্ষেত্রে তা অনেক দিনেরও হতে পারে। এক দুই কথাতেই যে সবাই পটিতে যেয়ে টুপ করে বসে পড়বে তার কিন্তু কোন গ্যারান্টি নেই। তাই, মা হিসেবে আপনাকে একটু ধৈর্য ধরতেই হবে। 

কিছু টিপস

পটি ট্রেনিং সফল করতে ধৈর্য্য ধরার পাশাপাশি কিছু কৌশলও অবলম্বন করলে ভালো। সেই লক্ষ্যে আপনাদের জন্য কিছু টিপস হল-

১. সবচেয়ে ভালো হয় শিশুকে শুরু থেকেই টয়লেটে নেয়ার অভ্যাস করতে পারলে এবং পটি টয়লেটেই রাখলে। তবে একদম প্রথমে এটি সম্ভব হবে না হয়তো। তাই হাতের নাগালেই পটি রাখার ব্যবস্থা করুন। 

২. বাচ্চারা মূলত দেখে শেখে। ট্রেনিং এর আগেই শিশুকে তার পুতুল দিয়ে পটি ব্যবহারের ডেমো দেখানো যেতে পারে।

৩. পটি ট্রেনিং শুরু করার আগে থেকেই ওকে জানিয়ে রাখুন যে সে এখন বড় হয়ে গেছে, আর তাই তার ডায়পার পড়ার দিন শেষ! শিশুরা বড়দের মত আচরণ করতে চায়। এই একটি কথা তাই তার মনে আগ্রহ জাগাতে পারে।

৪. ট্রেনিং এর সময়ে ওকে অধিক পরিমাণে পানি বা জুস খাওয়াতে পারেন, এতে আপনার সুবিধা হবে। 

৫. ওকে উৎসাহ দেবার জন্য ওর প্রতিটি সফল প্রয়াশে ওকে পুরুস্কৃত করুন। চকলেট, ক্যান্ডিই দিতে হবে এমনটা কিন্তু না। ওর গালে একটা চুমুও কিন্তু হতে পারে অনেক বড় পুরুষ্কার!

৬. মনে রাখবেন হিসু আর হাগুর ট্রেনিং (poo training) কিন্তু এক নয়। পু ট্রেনিং আরো উপরের লেভেলের। অনেকেই এ ট্রেনিং রপ্ত করে দেরিতে। 

৭. ট্রেনিং পিরিয়ড খুব দীর্ঘ হলে মাঝে সপ্তা খানেক গ্যাপ দিয়ে নিজেকে ফুল রিচার্জ করে নিতে পারেন।

৮. নির্দিষ্ট বিরতিতে টয়লেট করার অভ্যাস করতে একটা কৌশল অবলম্বন করতে পারেন- কিছুক্ষণের জন্য ওকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হোন, ডায়াপার ছাড়া। তবে তার আগে পটিতেই টয়লেট করার অভ্যাস করিয়ে নিতে হবে।

৯. নিজে নিজে যাতে পটি ব্যবহার করতে পারে সেজন্য ওকে কিছু সহজে খোলার মতো লুজ প্যান্ট কিনে দিন।

১০. পটিতে বসানোই ট্রেনিং এর শেষ কথা না। সাথে সাথে বাচ্চাকে কি করে পরিষ্কার হতে হয় তাও শেখাতে হবে। সব শেষে হাত ধোয়ানোর অভ্যাস করাতে হবে।

আজকাল ইউটিউবেও পাওয়া যায় পটি ট্রেনিং এর নানান এনিমেশন ভিডিও, যেসব দেখে বাচ্চারা পটিতে বসতে উৎসাহ পায়। তাছাড়া পটি ট্রেনিং সম্পর্কে আরো অনেক কৌশল আছে আমাদের মা-খালাদের ঝুলিতে। একটা না একটা কৌশল আপনার সন্তানের ক্ষেত্রে খাটবেই ইন শা আল্লাহ। এভাবেই আপনার চোখের সামনে আপনার ছোট্ট বাচ্চাটি আজ পটিতে বসতে শিখবে, তো কাল নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে। 

ছবি: Verywell family

লেখাটি রিভিউ করেছেন –

ডাঃ নুসরাত জাহান প্রমা
এমবিবিএস
জেনারেল প্র্যাকটিশনার