২০১৫ এর কথা। ফ্যামিলি থেকে দূরে বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রথম প্রেগন্যান্সী। সত্যি বলতে এই বিষয়ে কোন ধারনাই নেই। পরিচিত লোকজনের কাছ থেকে শুনলাম এক জায়গায় নাকি কিছু ক্লাস হয়, যেগুলো প্রেগন্যান্সীর ব্যাপারে জানতে সাহায্য করে। আগ্রহ নিয়েই সেখানে গেলাম। নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে বেশ কিছু ক্লাস করলাম। ভীষণ ইনফরমেটিভ। যারা ক্লাস নেন এত যত্ন করে নেন আর এত সাবলীল ভাষায় বুঝিয়ে বলেন, খুব ভালো লাগলো। বেশ কিছু টপিক নিয়ে আলোচনা হলো।

প্রেগন্যান্সীর খুব বেসিক কিছু বিষয়ে আইডিয়া পেলাম। উইক বাই উইক চেইঞ্জ, প্রেগন্যান্সীতে কি ধরনের শারীরিক পরিবর্তন আশা করা যাবে, লেবারের প্রিপারেশন কিভাবে নিতে হবে, নতুন বেবির টেইক কেয়ার কিভাবে করতে হবে, কিভাবে ব্রেষ্টফিডিং করাতে হবে এইসব বিষয়ে। পরে জানলাম এই ধরনের ইনফরমেটিভ ক্লাসগুলোকে বলে প্রি-ন্যাটাল ক্লাস।

এই ইনফরমেশন বেইসড ক্লাসগুলো আমাকে সাহায্য করছে লেবারের প্রিপারেশন নিতে, লেবার ফেইস করতে, এবং পরবর্তীতে একা হাতে বাচ্চা পালতে। প্রথম ডেলিভারির পর সেসময়ের করা ক্লাস, টুকটাক পড়াশুনা নিয়ে টপিক বেইজড লেখালেখি শুরু করলাম। একটা পর্যায়ে এসে মাতৃত্বের সাথে যোগ দেই। সেই সময়ে করা ক্লাসগুলো এতই ভালো লেগেছিলো যে বারবার মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশে যদি এরকম ক্লাসের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে প্রেগন্যান্ট মায়েরা কত উপকৃত হতো! মাতৃত্ব টিমকেও জানালাম আইডিয়ার কথা, কিন্তু সেটা তখন বাস্তবায়ন হয়ে উঠে নি।

এরপর দুইবছরের মাথায় সেকেন্ড প্রেগন্যান্সী। আগের জানা ইনফরমেশনের অনেক কিছু ভুলে গেছি। আবারও গেলাম সেই একই জায়গায় প্রি-ন্যাটাল কোর্স করতে। সেই একই ইন্সট্রাকটর, একই হাসিমুখ। এবার মেয়েকে নিয়ে যেতাম, মেট্রোতে করে অনেকটা পথ পার হয়ে। একবারো মনে হয়নি কি দরকার একই জিনিস আবার করার। এত বেশি উপকৃত হয়েছি, এত প্রভাবিত করেছে আমাকে তখন থেকে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করেছি কিভাবে এই বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আরও জানা যায় আর কিভাবে কমিউনিটিতে ইমপ্যাক্ট রাখতে পারি।

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে মাতৃত্ব ডট কম পরিচালিত সামাজিক চ্যানেলে যোগ দিন

এর দুইবছরের মাথায় থার্ড প্রেগন্যান্সী। শহর বদলে অন্য শহরে চলে এসেছি। যেখানে যা অনলাইন সোর্স পাই, ঘাঁটাঘাঁটি করি, পড়ার চেষ্টা করি। ততদিনে মাতৃত্ব’র সাথে থেকে এটা আমার অন্যতম ভালো লাগার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভাবতে লাগলাম নন-মেডিকেল পারসন হিসেবে কিভাবে নিজেকে ডেভেলপ করা যায়।

থার্ড প্রেগন্যান্সীতে অবস্ট্রেটিশিয়ানের বদলে আমি মিডওয়াফ নিলাম। ততদিনে মিডওয়াইফ, দৌলা এই টার্মগুলার সাথে পরিচিত। সেসময় অলরেডি এডুকেশনে সেকেন্ড মাস্টার্স করছি, দুই বাচ্চার টেইক কেয়ার, হোমস্কুলিং সব সামলিয়ে নতুন কোন সাবজেক্টে দীর্ঘমেয়াদে সময় দেয়া অসম্ভব। নিজেকে জিজ্ঞাস করলাম কি চাই আমি। উত্তর খুব সহজেই মিলল, আমি আসলে প্রেগন্যান্ট মা দের সাপোর্ট দিতে চাই। ইনফর্মেশন দিয়ে, খুব ছোট ছোট কিন্তু বেসিক জিনিসগুলো জানিয়ে।

এক বন্ধুর মাধ্যমে আমানী বার্থের চাইল্ড বার্থ এডুকেটর কোর্স সম্পর্কে জানলাম। চট করে ভর্তি হলাম। কোভিডের সময়। স্বাভাবিক সময়ের অফলাইন ক্লাস এখন অনলাইনে। থার্ড প্রেগন্যান্সীতে নিজে প্রি-ন্যাটাল ক্লাস করার বদলে, কিভাবে অন্যদের প্রি-ন্যাটাল ক্লাস নিতে হয়, সেটার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিলাম। মাসজুড়ে ক্লাস করলাম, রেগুলার এসাইনমেন্ট জমা দেয়া, বুক সামারি, অন্য একজন প্রেগন্যান্ট মায়ের হাতেকলমে ক্লাস নেয়া, সব শেষে ফাইনাল এক্সাম দেয়া। যেদিন সার্টিফিকেট হাতে পেলাম, মন থেকে আলহামদুলিল্লাহ্‌ বলেছি।

আমানি বার্থের এফিলিয়েটেড মেম্বার আমি এবং এর বাংলা ট্রান্সলেশন টিমের সাথে জড়িত। ততদিনে প্র্যাকটিস করতে পরিচিত গণ্ডীতে ক্লাস নিয়েছি। পড়াশুনা, ফ্যামিলি রেসপনসিবিলিটিজ এগুলোর বাইরে এই চাইল্ড বার্থ এডুকেটর হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে আমানি বার্থের হাত ধরে। স্বপ্ন দেখি, একদিন সব প্রেগন্যান্ট মায়েরা প্রেগন্যান্সী নিয়ে জানার আগ্রহ দেখাবে। প্রাকৃতিক প্রসব স্বাভাবিক হবে। মায়েরা প্রেগন্যান্সী নিয়ে জানবে আর সারাজীবন মনে রাখার মতো একটা এম্পাওয়ার্ড প্রেগন্যান্সী এক্সপিরিয়েন্স লাভ করবে।


আমানি বার্থ সম্পর্কে

আমানি বার্থ হল ইসলামিক দৃষ্টভঙ্গী থেকে সন্তান জন্মদান সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন এবং দৌলা প্রোগ্রাম। এদের লক্ষ্য হলো নারীদের সন্তান জন্মদানের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষিত করার মাধ্যমে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহনে সহায়তা করা।

আমানি বার্থ বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সব কিছুর নিয়ন্ত্রণে আছেন এবং মহিলাদের তিনি গর্ভধারণ, জন্মদান এবং তাদের বাচ্চাদের প্রতিপালনের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

গর্ভাবস্থায় নারী শরীরে যেসব পরিবর্তন আসে সেগুলো নিয়ে জানতে দম্পতিদের সাহায্য করে আমানি বার্থ। এছাড়াও প্রশিক্ষনের মাধ্যমে তাদের প্রস্তুত করে যাতে তারা জানতে পারে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের কী করণীয়, সম্ভাব্য বিকল্পগুলো কি কি। এসব জানার মাধ্যমে একজন মা তার সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে আত্মবিশ্বাসী বোধ করেন এবং তার ডাক্তার/নার্সের সাথে বুদ্ধিমত্তার সাথে কথা বলতে পারেন।

আমানি বিশ্বাস করে জ্ঞান হল শক্তি এবং প্রস্তুতি হল চাবিকাঠি। যেহেতু সব জন্মদান প্রক্রিয়া পাঠ্যবইয়ের বিবরণমতো আগায় না, তাই পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে প্রয়োজনমতো আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব, এবং একজন মা তার নেয়া সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকবেন।

আফিফা রায়হানা,
চাইল্ড বার্থ এডুকেটর
আমানি বার্থ।

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা