নবজাতকের জন্য মায়ের দুধ আল্লাহর দেয়া সবচেয়ে খাঁটি খাবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৬ মাস পর্যন্ত একটা বাচ্চা শুধু মায়ের দুধই খাবে। কিন্তু আমরা মায়েরা অনেকসময়ই বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে বুকের দুধের বদলে বা একইসাথে মানুষের তৈরি ফর্মুলা দিয়ে দেই। বাজারে কিনতে পাওয়া যায় এমন ফর্মুলা আর মায়ের বুকের দুধ কি একই গুণমান সম্পন্ন?

গবেষণা কী বলছে

গবেষণায় দেখা গেছে বাচ্চার ক্রম বিকশিত মস্তিষ্ক এর জন্য সঠিক পরিমাণে মিশ্রিত ফ্যাটি এসিড থাকে মায়ের দুধে। বিশেষ করে ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড ডিএইচএ (Omega 3 Fatty Acid DHA)। যদিও বর্তমানে ফর্মুলাগুলোতে ফ্যাটি এসিড যুক্ত করা হচ্ছে, তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে গবেষকরা নিজেরাই এখনো এবিষয়ে ঐক্যমতে পৌছুতে পারেননি যে ফর্মুলা দুধে কোন বয়সের বাচ্চার জন্য ঠিক কী পরিমাণ ফ্যাটি এসিড থাকা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যে ১৪,৬৬০ টি বাচ্চার উপরবড় পরিসরে একটা গবেষণা করা হয় । সেই গবেষণায় পাওয়া যায় যেসব বাচ্চারা মায়ের বুকের দুধ খায়নি তারা অল্প হলেও মায়ের বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের থেকে মোটর স্কিলের ক্ষেত্রে ৩০ ভাগ পিছিয়ে আছে। আর অন্তত ৪ মাস সম্পূর্ণ মায়ের বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের থেকে বিকাশগতভাবে পিছিয়ে আছে ৪০ ভাগ। 

বেলারুসে হয় ১৭,০৪৬ টি ৬ বছরের বাচ্চার উপর আরেকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য গবেষণা। একভাগ ছিলো যারা নবজাতক অবস্থায় পুরোপুরি মায়ের বুকের দুধ খেয়েছে এবং আরেকভাগ ছিল যারা মায়ের বুকের দুধ খায়নি। ওয়েসলার এব্রিভিয়েটেড স্কেইল অফ ইন্টেলিজেন্স (WASI Test) অনুযায়ী বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চাদের  উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ স্কোর ছিল। সাথে শিক্ষকের করা মুল্যায়নেও পাওয়া যায় সেসব বাচ্চাদের পড়া, লেখা এবং গণিতে উচ্চ স্কোর পেয়েছে।

বুকের দুধ = সঠিক অনুপাত

উপরে বর্ণিত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতোই আরও অনেক ফাঁকফোকর রয়ে যায় ফর্মুলা দুধে, যেসব নিয়ে একজন স্তন্যদানকারী মায়ের কখনো ভাবতে হয়না। কারণ তার বুকের দুধ প্রতি মুহূর্তে উৎপাদিত হচ্ছে সঠিক উপাদানের সঠিক মিশ্রণে। তাছাড়া বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মায়ের সাথে বাচ্চার একটি স্বর্গীয় বন্ধন তৈরি হয়। যখন মা তার বাচ্চাকে কাছে নিয়ে দুধ খাওয়ায় সেটা বাচ্চার মানসিক বিকাশেও অনেকটা প্রভাব ফেলে।

ফর্মুলা দুধের সীমাবদ্ধতা

কয়েক বছর পরপরই ফর্মুলা প্রস্তুতকারকেরা নতুন উপাদান যুক্ত করে যাতে ফর্মুলাকে মায়ের বুকের দুধের মতো বানানো যায়। কিন্তু তারা এটা কখনো বলেনা যে মায়ের বুকের দুধে থাকা অত্যাবশ্যক, জীবন্ত কিছু উপাদান কখনোও প্যাকেটে ফর্মুলায় বেঁচে থাকেনা। সুতরাং এই উপাদান গুলো সবসময়ই ফর্মুলাতে অবর্তমান থাকবে।

এছাড়া যতই নতুন উপাদান যুক্ত করা হোক না কেন, আরও শত শত উপাদান থেকে বঞ্চিত ফর্মুলা দুধ খাওয়া শিশুরা। এর মধ্যে এমন কিছু উপাদানও আছে যেগুলো এখনও বিজ্ঞান চিহ্নিত করতে পারেনি। নবজাতককে ফর্মুলা না দিয়ে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ দেয়ার জন্য আমাদের না জানাটাই যথেষ্ট কারণ হতে পারে।

তাই মায়ের বুকের দুধই সর্বক্ষেত্রে ভালো এবং সবচেয়ে সহজ বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য। তবে এরপরও অনেক কারণে একজন মা বাচ্চাকে কৌটার দুধ খাওয়াতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে বাচ্চার মা-বাবাকে ফর্মুলা দুধের ভালমন্দ জেনে সিদ্ধান্তটি সচেতনভাবে নিতে হবে।

এসম্পর্কিত আরো লেখাঃ বাচ্চাকে কতটুকু ফর্মুলা দুধ খাওয়াবেন?

তথ্যসূত্র

১. Sacker, A., M. a. Quigley and Y. J. Kelly. 2006. Breastfeeding and developmental delay: Findings from the millennium cohort study. Pediatrics 118:e682-e689

২. Kramer, M. S., T. Guo, R. W. Platt, I. Vanilovich, Z. Sevkovskaya, L. Dzikovich, K. F. Michaelson, K. Dewey, and Promotion of Breastfeeding Intervention Trials Study Group. 2004. Feeding effects on growth during infancy. Journal of Pediatrics 145(5):600-605

৩. Breastfeeding Made Simple by Kathleen Kendall-Tackett and Nancy Mohrbache