আপনি এখন ২০ তম সপ্তাহ শুরু করেছেন, তারমানে প্রেগন্যান্সীর সময়কালের প্রায় মধ্যবর্তী সময়ে আছেন। প্রেগন্যান্সীর এই পঞ্চম মাসটিতে আপনার ও আপনার ভেতরের বর্ধিষ্ণু শিশুটির বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। অনেক বাবা-মা খুব আগ্রহী থাকেন জানতে যে গর্ভস্থ শিশুটি মেয়ে নাকি ছেলে। দ্বিতীয় ট্রাইমিষ্টারের আল্ট্রাসাউন্ডে সেটি বুঝতে পারা যায়।

বাচ্চার জেন্ডার জানার এই এনাটমি স্ক্যানটি ১৮-২৪ সপ্তাহে করা হয়ে থাকে। আপনি যদি সারপ্রাইজ চান, তাহলে ডেলিভারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন। কিন্তু যদি শিশুটি ছেলে নাকি মেয়ে, সেটি জানতে চান এবং সেভাবে শিশুর জন্য প্রস্তুতি নিতে চান, তাহলে এরকম সময়ে এসে আপনার অপেক্ষার প্রহর শেষ হবে।

এছাড়া এনাটমি স্ক্যানে বাচ্চার ক্রম বর্ধমান অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পরিমাপ নেয়া হয়, এতে শিশুটি স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে কিনা তা জানা সম্ভব হয়।

প্রথমবারের মায়েরা অনেক সময় বাচ্চার নাড়াচাড়া বুঝতে পারেন না। গ্যাস বা পেটে এ জাতীয় শব্দের অনুভূতি অনেক সময় নাড়াচাড়া মনে হয়। আপনি এখনো যদি শিশুর নাড়াচাড়া বুঝতে না পারেন, খুব শিগগীরই পারবেন, ইনশাআল্লাহ্‌।

আপনার শরীরের পরিবর্তন

২০ সপ্তাহে এসে আপনার ওজন বাড়ছে। পেটের আকারও বাড়ছে। প্রেগন্যান্সী খুব পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান।আপনার ইউটেরাস আকারে বেড়েছে, তাতে শিশুটির নাড়াচাড়া করার মতো যথেষ্ট জায়গা তৈরি হয়েছে। সে প্রায়শই সেখানে নড়েচড়ে তার অবস্থান পরিবর্তন করে এবং আপনি সেটি অনুভব করতে পারেন।

প্রথম ট্রাইমিষ্টারের মর্নিং সিকনেস আপনার এখন আর নেই। আপনি রুচি ফিরে পেয়েছেন এবং খাবারের প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। এই সময়ে এসে আপনার চুল এবং নখের দারুণ পরিবর্তন খেয়াল করতে পারেন।

প্রেগন্যান্সী হরমোনের জন্য অনেকের চুল বেশ ঘন হয়। নখ দ্রুত বড় হয়, যদিও তা কিছুটা ভঙ্গুর হতে পারে। ডেলিভারীর পর তা আবার বিপরীত চিত্র ধারণ করতে পারে। অনেকের চুল পড়ার সমস্যা হয় ডেলিভারীর পর।

মায়েরা এসময় নিজের পেট কতটুকু বাড়ল এবং এই বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা জানতে খুব আগ্রহ বোধ করেন। মনে রাখবেন, সবার পেট একইরকম বাড়ে না এবং পেটের বৃদ্ধি সবসময় বাচ্চার বৃদ্ধিকে বোঝায় না।

জেনেটিক্যালি অনেকের প্রেগন্যান্সীতে পেট খুব একটা বাড়ে না। এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। আপনি স্বাস্থ্যকর ভাবে ওজন বৃদ্ধিতে মনযোগী হন। সাধারনত আল্ট্রাসাউন্ড আপনাকে নিশ্চিত করবে যে শিশুর বৃদ্ধি ঠিকমতো ঘটছে। এছাড়া ডাক্তাররা হাত দিয়ে আপনার পেটের পরিমাপ নিয়ে শিশুর বৃদ্ধি সম্পর্কে আপনাকে ধারনা দিতে পারে।

আপনার শিশুর পরিবর্তন

আপনার শিশুটির ওজন এই সময় প্রায় এক পাউন্ডের (১ পাউন্ড = ৪৫৩ গ্রাম) কাছাকাছি। লম্বায় সে প্রায় ১০ ইঞ্চির কাছে। শিশুটি এসময় ম্যাকনিয়াম তৈরির পর্যায়ে আছে।

ম্যাকনিয়াম হলো কালচে সবুজ বর্নের থকথকে এক পদার্থ যা হজমের সময় উৎপন্ন হয়। শিশুর জন্মের পর প্রথম মলত্যাগে আপনি এটা দেখতে পাবেন। তবে কিছু শিশু মায়ের পেটে থাকা অবস্থায় অথবা ডেলিভারীর সময় ম্যাকোনিয়াম ত্যাগ করতে পারে।

ছেলে এবং মেয়ে শিশুর প্রজননতন্ত্রের গঠন চলতে থাকে। মেয়ে শিশুর বেলায় তার ইউটেরাস এই সপ্তাহে এসে পরিপূর্ন রূপ ধারণ করে। ভ্যাজাইনাল ক্যানেলের গঠন শুরু হয়। এমনকি ওভারিতে ডিম্বাণুর গঠন হয়ে থাকে। ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে টেস্টিকল এবং স্ক্রোটাম এর গঠন চলতে থাকে।

আপনার জন্য টিপস

  • অনেক মায়েরা এরকম সময় পায়ের গোড়ালি এবং পায়ে পানি আসার সমস্যায় (Edema) ভোগেন। যাদের এরকম পায়ে পানি আসার সমস্যায় ভোগেন, তারা টাইট মোজা পরবেন না এবং জুতার ক্ষেত্রে এক সাইজ বড় জুতা ব্যবহার করতে পারেন। শুয়ে বা বসে থাকা অবস্থায় পা কিছুটা উঁচু অবস্থানে রাখবেন, ফোলাভাব কমে আসতে সাহায্য করবে। ঈষদুষ্ণ গরম পানিতে পা ডুবিয়ে রাখলে আরাম পেতে পারেন।
  • লেগ ক্রাম্প অনেকের জন্য কমন সমস্যা প্রেগন্যান্সীর এই পর্যায়ে। এটা অনেকের ঘুমের মধ্যেও এমনভাবে হয় যে ব্যথা ও অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রেগন্যান্সীতে বাড়তি ওজনের জন্য পায়ের রক্তনালিকাগুলো সংকুচিত হয়ে আসে, এ কারনে এরকম লেগ ক্রাম্প হতে পারে। পা কিছুটা উঁচু অবস্থানে রাখলে আরাম পাওয়া যাবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান করুন। ঘুমের ভেতর এরকম লেগ ক্রাম্প বোধ করলে জেগে উঠে পায়ে ম্যাসাজ করুন। সম্ভব হলে পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ান। তবে আচমকা উঠে দাঁড়াবেন না। হালকা স্ট্রেচ করে, তারপর দাঁড়াবেন।
  • অনেক মায়েদের নাভি বাইরের দিকে বের হয়ে আসে, যা স্বাভাবিক। বর্ধিত জরায়ু যখন পেটের বাইরের দিকে চাপ দেয়, নাভি বাইরের দিকে বের হয়ে আসতে পারে। সন্তান জন্মের পর তা আবার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে।
  • ঠাণ্ডা বা গরম থেকে মাথা ব্যাথা হয় অনেকের। এরকম হলে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরম এড়িয়ে চলুন। মাথা ব্যাথায় শুরুতেই ওষুধের শরনাপন্ন না হয়ে খোলা বাতাসে হেঁটে আসতে পারেন। বদ্ধ জায়গা কিংবা অতিরিক্ত আলোর জন্য মাথাব্যাথা হলে জায়গার পরিবর্তন সাহায্য করতে পারে। অতিরিক্ত গরম বা বদ্ধ জায়গা যে শুধুমাত্র মাথা ব্যাথার জন্য দায়ী তা না, অনেক সময় তা মাথা ঘুরানো বা দূর্বলতা তৈরি করতে পারে। চুলার পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্না করার ফলেও এরকম হতে পারে। সেক্ষেত্রে ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিন। খোলা বাতাসে হেঁটে আসুন। হালকা পাতলা পোশাক পরুন, যাতে আলো হাওয়া গায়ে লাগে।
  • প্রেগন্যান্সীতে স্ট্রেচিং জাতীয় এক্সারসাইজ খুব ভালো। অনেক ধরনের ব্যাথায় আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু স্ট্রেচিং এর সময় সাবধানে থাকবেন। এসময় হাড়ের গড়ন দূর্বল হয়ে যায়, অতিরিক্ত স্ট্রেচিং অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে। স্ট্রেচিং করা অবস্থায় যখনই খারাপ বোধ করবেন, থামিয়ে বিশ্রাম নিবেন।
  • ২০ তম সপ্তাহে এসে অনেকের আয়রন লেভেল কমে যায়। যেহেতু বাচ্চারও রক্তের লোহিত কণিকা তৈরি হচ্ছে। টুইন বা একাধিক বাচ্চার মায়েরা এবং যারা আগে থেকে পুষ্টিহীনতায় অথবা এনিমিয়ার সমস্যায় ভুগছেন, তারা সাবধানে থাকবেন। আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাবেন। আয়রনের অভাবে শারীরিক দূর্বলতা প্রকট হয়। প্রয়োজনে ডাক্তার আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিবেন।
  • ঘনঘন ক্ষিধা লাগলে স্ন্যাকস হিসেবে বাদাম খেতে পারেন। বাদাম প্রোটিন, জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়ামের খুব ভালো উৎস। নানান ধরনের বাদাম খাওয়া কেবল যে ভালো স্ন্যাকস, তাই না, বরং শরীরের এসব খাদ্য উপাদানের প্রয়োজন মিটাবে।

প্রেগন্যান্সী জীবনের স্মরণীয় একটা সময়। ২০ সপ্তাহে এসে আপনি প্রেগন্যান্সীর অর্ধেক সময় পার করে ফেলেছেন। বাকী সময়টাও যাতে সুন্দরভাবে পার হয়, তার জন্য সচেষ্ট হোন। ভালো খাবার, এক্সারসাইজের পাশাপাশি হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন। পরিবারের অন্য সদস্যরা মা কে শারীরিক- মানসিক ভাবে ভালো থাকার জন্য চেষ্টা করতে পারেন।

তথ্যসূত্র

  • Your Pregnancy and Childbirth, Month to Month (5th Edition); The American College of Obstetricians and Gynecologists.
  • Week by week pregnancy, Whattoexpect.com
লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা