ব্রেষ্টফিডিং বন্ধের গল্প

আপনি যদি ব্রেষ্টফিডিং করানো মা হোন, এবং দুই বছর পূর্ন করে বুকের দুধ খাওয়ানোর, অভিনন্দন আপনাকে। আপনি অবশ্যই একটা সার্টিফিকেট পাওয়ার যোগ্য। জন্মের পর থেকে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বুকের দুধই বাচ্চার জন্য প্রধান খাদ্য। জন্মের পরপর শাল দুধ থেকে শুরু করে, বেশী কিছু মাস বুকের দুধ ছাড়া আর কিছুই লাগে না। তারপর সলিড শুরু হলেও, বুকের দুধ চলতে থাকে।

ব্রেষ্টফিডিং, বাচ্চা এবং মা দুইজনের জন্যই ধৈর্য্যের ব্যাপার। শুরুটা সবার খুব সহজ হয় না। ব্রেষ্টফিডিং করানোটাও একটা শেখার ব্যাপার। এতে চ্যালেঞ্জ আছে, আছে ভালো-খারাপ নানান রকম অভিজ্ঞতা। ব্রেষ্টফিডিংয়ের মাধ্যমে বাচ্চা আর মায়ের একটা চমৎকার বন্ডিং তৈরী হয়। পুরো ব্রেষ্টফিডিং জার্নি যথেষ্ট এডভেঞ্চারাস। এর শুরুটা যেমন এক্সাইটিং, শেষটাও তাই। কুরআনে প্রোপজড ব্রেষ্টফিডিং টাইম দুই বছর। এখনকার বিজ্ঞানও বলে, দুই বছর পর আর মায়ের দুধের দরকার পড়ে না। কারন এরপর সব প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বাচ্চা বাইরের খাবার থেকেই পেয়ে থাকে। ফুলটাইম ব্রেষ্টফিডিং করানো অনেক মায়ের জন্য বুকের দুধ ছাড়ানো বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারন পুরো সময় বুকের দুধ খাওয়ানা শিশু এত বেশী এটাচড্‌ থাকে মায়ের সাথে, বুকের দুধের প্রতি আকর্ষন এত বেশী থাকে, এটা খাওয়া ছেড়ে দেয়া, বাচ্চার জন্য কঠিন ব্যাপার।

জীবন থেকে নেয়া

এইবার আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলি। ঠিক দুইবছর পর্যন্ত ব্রেষ্টফিড করাবো, এইটাই প্ল্যান ছিলো। প্ল্যান যখন থাকে, সেটা ঠিকমতো বাস্তবায়নেরও সাব-প্ল্যান কিন্তু আমাদের থাকে। প্রথম সাড়ে পাঁচ মাস এক্সক্লুসিভ ব্রেষ্টফিড আমার মেয়ে। এরপর ডাক্তারের পরামর্শে সলিড শুরু। সলিডের পাশাপাশি দুই বছর ব্রেষ্টফিড করেছে। বুকের ছাড়ানোর প্রিপারেশন নিয়েছি দুই বছর হওয়ার ঠিক দুই/তিন মাস আগে থেকে। ধীরে ধীরে খাওয়ানোর পরিমান কমিয়ে এনেছি। সাথে সাথে মুখে চলেছে কাউন্সিলিং। সব শেষে বন্ধ করেছি রাতে খাওয়ানো, সবচেয়ে কঠিন মনে হচ্ছিলো। একদম বন্ধ করার পর কয়েকদিন হঠাৎ হঠাৎ খেতে চেয়েছে। কোন ঝামেলা করেনি, আলহামদুলিল্লাহ। দুই বছর পূর্ন হওয়ার একদিন আগ পর্যন্ত ব্রেষ্টফিড করেছে আমার মেয়ে। অন্য মায়েদের যেরকম অভিজ্ঞতা শুনেছি, ভেবেছিলাম কতটা কঠিন হবে। কিন্তু আল্লাহ সহজ করেছেন।

মায়েদের জন্য টিপস

  • বেশ খানিকটা সময় হাতে নিয়ে (অন্তত দুই মাস) পরিকল্পনা করুন। ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করুন।
  • অন্তত দুই-তিনমাস আগে থেকে মুখে বলতে থাকুন। (যেমনঃ তুমি তো বড় হয়ে যাচ্ছ। টডলার বেবিরা কিন্তু আর মার কাছ থেকে দুধ খায় না। ওরা গ্লাসে গরুর দুধ খায়।) আপনার হয়ত মনে হতে পারে, এত ছোট বাচ্চা কি বুঝবে। কিন্তু আসলেই বোঝে ওরা।
  • যখন থেকে খাওয়া কমিয়ে দেবার প্ল্যান করবেন, তখন থেকেই বাচ্চাকে ভরপেটে খাওয়ানোর পর, ব্রেষ্ট অফার করবেন। এতে বাচ্চা যেমন আস্তে আস্তে অভ্যস্থ হবে, ব্রেষ্টফিডিং বন্ধ করার পর মায়েরও কোন শারীরিক অস্বস্তি থাকবে না।
  • রাতে ভরপেটে খাইয়ে ঘুম পাড়ান। ঘুমের ভেতর বোতল দেয়ার অভ্যাস করবেন না (ব্রেষ্টফিডিং বন্ধ করার পরও)। এতে বাচ্চার দাঁত খুব দ্রুত ক্ষয়ে যায়। ডাক্তাররা বলেন একবছরের পর থেকে বাচ্চা বড়দের মতো সারারাত ঘুমানোর মতো সক্ষমতা অর্জন করে। কিছু বাচ্চা রাতে বারবার উঠে আর অনেক বাবা-মা’রাই রাতে খাওয়ান। এটা মোটেও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নয়।
  • ব্রেষ্টফিডিং বন্ধ করার পর এরসাথে যেসব জিনিসের সংশ্লিষ্টতা (Association) আছে, সেগুলো কয়দিন এড়িয়ে চলুন। যেমনঃ যে জায়গায় বসে দুধ খাওয়াতেন, যে বালিশ ব্যবহার করতেন, সেগুলো এড়িয়ে চলুন। বাচ্চাকে ভুলে যাওয়ার সুযোগ দিন।
  • বন্ধ করার পরও বাচ্চা খেতে চাইলে, ভুলিয়ে রাখুন। জেগে থাকলে খেলনা এটা-সেটা দিয়ে তার মনোযোগ ঘুরিয়ে দিন। ঘুমের মধ্যে কাঁদলে কোলে নিয়ে কমফোর্ট দিন। আবার ঘুম পাড়ান।
  • একবার পুরোপুরি বন্ধ করার পর, আর একেবারেই দিবেন না। এতে বাচ্চা-মা দুইজনেরই কিছু ইমোশনাল ব্রেকডাউন হয়। কিন্তু এটা না করলে, বন্ধ করতে পারবেন না।
  • বন্ধ করার আগে আগে বাচ্চাকে বড়দের রেগুলার দুধ দেয়া শুরু করেন। গরুর দুধ দিন, সম্ভব হলে বাচ্চার জন্য আলাদা গ্লাসে। অল্প অল্প করে দিন। তাকে নিজের খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠতে দিন। এই বয়সটা এমনিতেই ফিডার থেকে গ্লাসে ট্রানজিশনের সময়।
  • অবশ্যই অনেক অনেক দু’আ করবেন। এর কোন বিকল্প নাই।

দুই বছরটা বাচ্চার জন্য অনেকদিক দিয়েই টার্নিং পয়েন্ট। টেরিবল টু’তে বাবা-মা এমনিতেই বিপর্যস্থ থাকেন, আবার ব্রেষ্টফিডিং বন্ধ করাটাও চ্যালেঞ্জিং। যেটা মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকটা বাচ্চার সাথে সাথে প্রত্যেকটা মা’ও আলাদা। নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা করুন। বাচ্চার জীবনের ট্রানজিশনের সময়গুলো সহজ করার চেষ্টা করুন।