১৯ সপ্তাহ প্রেগন্যান্সী

আপনি যখন প্রেগন্যান্সীর ১৯ সপ্তাহে আছেন, আপনি প্রেগন্যান্সীর ৫ম মাসে আছেন। যদি আপনি এতদিনে বাচ্চার নাড়াচাড়া বুঝতে না পেরে থাকেন, তবে এখন থেকে পেতে পারেন। তবে প্রথম প্রেগন্যান্সী হয়ে থাকলে আরও পরেও তা অনুভব করতে পারেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিংবা আগে থেকে নাড়াচাড়া বুঝলে, এখন আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন। ২০ সপ্তাহের আল্ট্রাসাউন্ডে বাচ্চার বৃদ্ধি সম্পর্কে আপনি আরও পরিষ্কার ধারনা পাবেন। এই সময়ে যেহেতু আপনার বাচ্চার সাকিং ইন্সটিংক্ট তৈরি হয়েছে, পেটের ভেতরেই বাচ্চার বৃদ্ধা আংগুলী তার মুখের কাছে পৌঁছালে, সে হয়ত তা চুষতে শুরু করবে।

বাচ্চার পরিবর্তন

এই সপ্তাহে বাচ্চা আকারে খানিকটা বড় হয়েছে। লম্বায় সে এখন প্রায় ৬ ইঞ্চি, ওজন বেড়েছে আধা পাউন্ডের মতো। বাচ্চার শরীরে ভার্নিক্স তৈরি হয় এই সময়ে এসে। ভার্নিক্স ক্যাসিওসা হলো বাচ্চার চামড়ার উপর এক ধরনের সাদা দইয়ের মতো চটচটে পদার্থ, যা আপনি সন্তান জন্মাবার পর দেখতে পেতে পারেন। বাচ্চা যেহেতু এমনিওটিক ফ্লুইড অর্থাৎ পানির মধ্যে থাকে, এই ভার্নিক্স তার চামড়াকে বাহির থেকে সুরক্ষা দেয় এবং দীর্ঘসময় পানিতে থাকার পরও তা কুঁচকে যেতে দেয় না। এক সময় এই ভার্নিক্স মিলিয়ে যায়। কিন্তু সন্তান নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্মালে আপনি এই ভার্নিক্স দেখতে পাবেন। 

প্রথমবার যারা মা হচ্ছেন, তারা হয়ত বাচ্চার নাড়াচাড়া এতদিন বুঝতে পারতেন না, এই সপ্তাহে বুঝতে পারেন। মায়েদের জন্য এই নাড়াচাড়া বুঝতে পারাটা আসলেই অন্য রকম অভিজ্ঞতা এবং মায়েরা এর জন্য শুরু থেকই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। এই পর্যায়ে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো, বাচ্চার ফুসফুসের গঠনও চলছে। বিশেষ করে শ্বাসনালীর  ব্রংকিউলেস এর গঠন শুরু হয়েছে।

আপনার পরিবর্তন

এই পর্যায়ে এসে আপনি প্রেগন্যান্সীর অর্ধেক সময় পার করে এসেছেন। আপনি যেহেতু বাচ্চার নাড়াচাড়া বোঝার জন্য অপেক্ষা করে আছেন, পেটের মধ্যে গ্যাসের কারনে সৃষ্ট নাড়াচাড়াতেও আপনি সতর্ক হয়ে উঠছেন। বলা মুশকিল, আপনি যা অনুভব করছেন, আসলেই কি সেটা গ্যাসের নাকি আপনার বাচ্চার নাড়াচাড়া। প্রথম দিকে বাচ্চার মুভমেন্ট খুব হালকা থাকে, সময়ের সাথে সাথে আপনি শক্ত নাড়াচাড়া ফিল করা শুরু করবেন।

সেকেন্ড ট্রাইমিস্টারে ওজন বাড়ে, যার কারনে অনেকটা ভার আমাদের পায়ের উপর পড়ে। বর্ধিত জরায়ুর চাপে পড়ে পায়ে রক্ত চলাচলের ব্লাড ভ্যাসেলগুলো সংকুচিত হয়ে আসে বলে, অনেকের এই সময় লেগ ক্রাম্প হয়। অনেকের রাতে এই সমস্যা বেশি হয়। যখনই আপনার লেগ ক্রাম্প হবে, চেষ্টা করবেন পা টানটান করতে, নাড়াচাড়া করতে। অনেকের ঘুমের মধ্যে লেগ ক্রাম্প হয়। ব্যাথায় জেগে যাওয়াও অস্বাভাবিক না। ঘুম ভেঙ্গে গেলেও উঠে বসে চেষ্টা করবেন, পা নাড়াচড়া করতে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু গবেষণা বলে, এই ধরনের ক্রাম্পিং এর সাথে আমাদের খাদ্যাভাসের যোগ আছে। পরিমিত পানি খেয়ে শরীর হাইড্রেটেড থাকলে, এই সমস্যা আপনি কমিয়ে আনতে পারবেন।

অনেক প্রেগন্যান্ট মায়েদের ভেরিকোস ভেইন লক্ষ্যনীয় হয় এই সময়। বাড়ন্ত জরায়ু যখন আমাদের হার্টের পিছন থেকে পায়ে রক্ত সরবরাহকারী বড় নালিকাতে চাপ প্রয়োগ করে, তখন ভেরিকোস ভেইন (Varicose vain) দেখা যায়। এটা কখনো কখনো চুলকানিসহ অসুবিধা, এমনকি ব্যাথার কারনও হতে পারে। অনেকের আবার লম্বা সময় একভাবে শুয়ে বা বসে থাকলে এডেমা (Edema) হতে পারে। সাধারনত এটা সময়ের সাথে সাথে ঠিক হয়ে যাওয়া নির্দোষ এডেমা হলেও, অনেক সময় তা প্রি-এক্লেম্পশিয়ার কারন হতে পারে।

পেট আকারে বাড়াতে আপনি স্ট্রেচ মার্ক দেখতে পেতে পারেন। সবার যে স্ট্রেচমার্ক পড়ে তা না, তবে চামড়া শুষ্ক ও সংবেদশীল হলে, স্ট্রেচমার্ক খুব স্বাভাবিক। স্ট্রেচমার্কের কারনে অনেকের বেশ চুলকানি হয়। স্ট্রেচমার্কের কারনে এরকম চুলকানি স্বাভাবিক। এছাড়া মুখের চামড়া কিছুটা কালচে বর্ন ধারণ করা বা মুখে বাদামী দাগ ( chloasma) পড়ে অনেকের।

এই সপ্তাহে আপনার জন্য টিপস

·        প্রেগন্যান্সীতে অনেকে ভ্যাজাইনাল ইষ্ট ইনফেকশনে ভোগেন। এই সময় শরীরে এস্ট্রোজেন হরমোনের আধিক্য এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। ঘনঘন হলে, ডাক্তারের পরামর্শ নিন। যেহেতু সব ওষুধ প্রেগন্যান্সী সেইফ না, তাই ভ্যাজাইনাল ইষ্ট ইনফেকশনে প্রেগন্যান্সীতে ডাক্তাররা সাধারনত মুখে খাবার ওষুধ দেন না। ব্যবহারযোগ্য অয়েন্টমেন্টে বা ওষুধে ইষ্ট ইনফেকশন নিরাময়যোগ্য। সুতির ঠিলাঠালা অন্তর্বাস পরবেন।

·        শরীরে পানির অভাবে অনেক সমস্যার উদ্ভব ঘটে। লেগ ক্রাম্প ছাড়াও, মাথাব্যাথা, বমিভাব হতে পারে। প্রতিদিন ৮-১০ গ্লাস পানি খাবেন। এছাড়া জুস, প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল আপনার প্রতিদিনের ডায়েটে রাখবেন। কোষ্টকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতে ভালো কাজে দেবে। কোনভাবেই আপনি তা দূর করতে না পারলে প্রুন জুস খেয়ে দেখতে পারেন। গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকার মানুষের জন্য এমনিতেই পানি পরিমাণ ঠিক রাখতে পানি জাতীয় খাবারে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

·        ভালো ঘুমের জন্য আরামদায়ক বালিশ ব্যবহার করুন। দুই পায়ের ফাঁকে বালিশ রাখতে পারেন। পায়ের ব্যাথার জন্য পা কিছুটা উঁচু করতে রাখতে বালিশ ব্যবহার করতে পারেন।

·        শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে নিয়মিত কিছু শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন। প্রেগন্যান্সীতে ওজন বাড়ায় এবং অনেকে অফিস ডেস্কে লম্বাসময় একভাবে কাজ করায়, এইসময় করপাল টানেল এর সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত কিছু স্ট্রেচিং, বিশেষ করে হাতের, আপনাকে সাহায্য করবে ভালো বোধ করতে। সকালে ঘুম থেকে উঠলে কব্জি সহ আঙ্গুলে ব্যাথা করপাল টানেল সিন্ড্রোমের কারণ। এক্ষেত্রে স্ট্রেচিং ছাড়াও ঘুমানোর সময় রিষ্ট ব্যান্ড ব্যবহার করতে পারেন। এটি ঘুমের মধ্যে আঙ্গুল সহ কব্জি সোজা থাকতে সাহায্য করবে।

·        অনেকের প্রেগন্যান্সীতে খাবার ছাড়া অন্য নন-ফুড আইটেম খাবার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। কয়লা, সাবান, ছাই, চক -এধরনের খাবারে যদি আপনার ক্রেভিং থাকে, তাহলে সতর্ক হোন। এটাকে পিকা বলে এবং খাবারে পুষ্টির ঘাটতির জন্য (সাধারণত আয়রন এবং জিঙ্ক) এই সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় গ্যাষ্ট্রোইন্টেস্টেনাল সমস্যার (ডায়রিয়া, বমি, কোষ্টকাঠিন্য) জন্য এই ধরনের নন-ফুড আইটেম দায়ী থাকে। এরকম সময়ে চুইয়িং গাম চাবাতে পারেন। এছাড়া প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার, কচকচে সবজি (গাজর, আপেল, স্যালারি ইত্যাদি) আপনি নন ফুড আইটেমের ক্রেইভিং মেটাতে খেতে পারেন।

·        এডেমার জন্য পায়ে চাপ দিয়ে থাকে এমন মোজা পরতে পারেন। রাতে শোয়ার সময় পায়ের নীচে বালিশ দিয়ে কিছুটা উঁচু করে রাখতে পারেন। এক ভাবে লম্বা সময় শুয়ে বা বসে থাকা থেকে বিরত থাকুন।

·        পেটে, পায়ে বা শরীরের অন্যান্য জায়গায় স্ট্রেচমার্ক এড়ানোর জন্য চামড়া ময়েশ্চার রাখার চেষ্টা করুন। খাঁটি নারকেল তেল বা অলিভ ওয়েল ব্যবহার করতে পারেন। বায়ো ওয়েল, ভ্যাসলিন ব্যবহার করেন অনেকে। এতে স্ট্রেচমার্ক এড়ানো না গেলেও কমানো সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

শারীরিক নানান অসুবিধা, হরমোনের উঠানামা এর মধ্যেও চেষ্টা করুন প্রেগন্যান্সীকে উপভোগ করতে। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া, এক্সারসাইজ যেমন আপনাকে শারীরিক ভাবে কর্মক্ষম রাখবে, তেমনি নিজের মতো মানসিক ভাবে ভালো থাকার চেষ্টা করুন। প্রেগন্যান্সী, প্যারেন্টিং নিয়ে জানার চেষ্টা করুন। প্রতিদিন শরীরে রোদ লাগান, খোলা বাতাসে হাঁটুন। ভালো লাগার কাজগুলো করুন।

রেফারেন্স

Dr. Sruti, M. Understanding Pica (Eating Disorder), https://www.medicinenet.com/understanding_pica_eating_disorder/article.htm

19 Weeks Pregnant, https://www.whattoexpect.com/pregnancy/week-by-week

Week by week guide to pregnancy, NHS Better Health, https://www.nhs.uk/start-for-life/pregnancy