আপনি যদি ইতিমধ্যে আপনার জীবনের বিশটি বসন্ত পার করে থাকেন, তাহলে আপনি বুঝবেন, মানবজীবনে ২০-৩০ বছর বয়স কত গুরুত্বপূর্ণ। জীবনকে উপলব্ধি করার মূল বয়সই হল এটা। হঠাৎ করে নাই হয়ে যাবে বয়ঃসন্ধির অস্থিরতা, ভর করবে প্রজ্ঞা, বাড়বে দায়িত্ব। এভাবেই স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার হিসেব মেলানো শেষে একদিন পূর্ণরূপে আবির্ভুত হবে আপনার নারীত্ব।

বিশ থেকে ত্রিশ, জীবনের এ ভাগে আপনার এক একটি সিদ্ধান্ত জীবনের মোড়ও ঘুরিয়ে দিতে পারে- শুধু আপনার নয়, আপনার সন্তানেরও। কারণ, এ বয়স যে মূলত মাতৃত্বের বয়স। তাই বলাই বাহুল্য, এ সময়ে আপনার শরীরের সঠিক পুষ্টি  অবস্থা অনেক জরুরি। এমনকি পাতে কতটুকু খাবার নিলেন, সেটাও অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  

পরিমাণমত খাবেন, সুষম খাবার খাবেন- এগুলো পরিচিত পরামর্শ এই বয়সীদের ক্ষেত্রেও একই ভাবে প্রযোজ্য। তবে প্রজননক্ষম বয়স হওয়ার কারণে কিছু পুষ্টি উপাদানের উপর বাড়তি জোর দেয়া হয়। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য তো বিশেষ পুষ্টি চাহিদা রয়েছেই, তাই এখানে মোটাদাগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হল-

• ক্যালোরি: 

আর্টিকেল নিয়ে আপনার প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা বা ফীডব্যাক শেয়ার করতে পাবলিক টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন
মাতৃত্বের বিভিন্ন নোটিফিকেশন পেতে হোয়াটসএপ গ্রুপে যোগ দিন। এই গ্রুপে শুধুমাত্র এডমিন মেসেজ পাঠান।

কি করে বয়স অনুযায়ী ক্যালোরি গণনা করে খাওয়া যায় তা টিনএজ মেয়েদের সঠিক পুষ্টি লেখায় বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতিদিনের ক্যালোরি চাহিদা পূরণ করলেই কেবল হবে না, সব জাতীয় খাবার খেতে হবে এবং তা হতে হবে পরিমাণমত।

চিত্রটি দেখুন। কোন খাবার কি রকম পরিমানে খেতে হবে তার একটি ধারনা দেয়া হয়েছে। আপনার দৈনিক চাহিদা যদি হয় ২০০০ কিলোক্যালোরি তাহলে আপনি নিচের সার্ভিং বা পরিবেশন মেনে খাবেন-

ভাত, রুটি: ৬-৮ সার্ভিং (১ সার্ভিং = আধ কাপ ভাত/ ১টি রুটি)

শাক সবজি: ৪-৫ সার্ভিং (১ সার্ভিং = ১ কাপ কাচা সবজি/ আধ কাপ রান্না সবজি)

ফলমূল: ৩-৪ সার্ভিং (১ সার্ভিং = ১টি ফল/ অর্ধেকটি মিষ্টি ফল)

মাছ, মাংস, ডিম: ২-৩ সার্ভিং (১ সার্ভিং = ১টি মাঝারি টুকরা)

ডাল, বীজ, বাদাম: ২ সার্ভিং (১ সার্ভিং = ১ কাপ ডাল/ ১ মুঠ বাদাম)

দুধ জাতীয় খাদ্য: ২ সার্ভিং (১ সার্ভিং = ১ কাপ তরল দুধ)

তেল, মাখন: যতটা কম সম্ভব (১ সার্ভিং = ১ চা চামচ তেল)

চিনি: যতটা কম সম্ভব (১ সার্ভিং = ১ চা চামচ চিনি)

• প্রোটিন:

অনেকে মনে করেন শরীর বৃদ্ধির বয়স পার হয়ে গেলে প্রোটিনের আর তেমন চাহিদা থাকে না। কিন্তু কথাটি ঠিক নয়। শরীর আর দৈর্ঘ্যে না বাড়লেও, হরমোন, এনজাইম সহ আরো অনেক জরুরি উপাদান তৈরিতে প্রোটিন প্রয়োজন, দিনে অন্তত ৬০ গ্রাম। প্রাণিজ প্রোটিন ছাড়াও বাদাম, ডাল, মটরশুঁটি ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ প্রোটিন প্রয়োজন।

তাই বলে আবার অতিরিক্ত প্রোটিন খেলে চলবে না। অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণের ফলে আজকাল অনেকেই অল্প বয়সে আথ্রাইটিস এর রোগী হয়ে যাচ্ছে।

• ‎কার্ব:

কার্বের অভাব সচরাচর হয়না, বরং বেশিই খাওয়া হয়ে যায়। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত

কার্বই হলো এ বয়সে স্থূল এবং একই সাথে অবসাদগ্রস্থ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই এটি খেতে হবে পরিমিত, চেষ্টা করতে হবে চিনি ও যাবতীয় প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলা।

• ফ্যাট:

বিভিন্ন প্রকারের ফ্যাটি এসিড রয়েছে, তার মধ্যে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড সমূহ এই বয়সীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার শরীরে সেরেটোনিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করবে, যা হলো মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতিটি কাজ করানোর এক রাসায়নিক পদার্থ। যেহেতু এই সময়টাতে হতাশাগ্রস্ত থাকার প্রবণতা বেশি লক্ষণীয়, তাই শরীরে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের সঠিক চাহিদা পূরণ করা বেশ প্রয়োজন। সামুদ্রিক মাছ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের  সবচাইতে ভালো উৎস। এছাড়াও অন্যান্য মাছ, মাংস, বিভিন্ন বাদাম, বীজ ইত্যাদি থেকেও এর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

• ‎ক্যালসিয়াম:

মানব শরীর প্রায় ২৫ বছর পর্যন্ত হাড় গঠন করতে থাকে। তাই এ সময়ে দেহের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করা খুবই জরুরি। নাহলে শেষ বয়সে হার ক্ষয়ে যাবে। অনেকে তো মধ্যবয়সেই ক্যালসিয়ামের অভাবে শরীরে ভীষণ ব্যথা অনুভব করেন।

প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের শরীরে ক্যালসিয়ামের দৈনিক চাহিদা হল প্রায় ১০০০ মিলিগ্রাম। ১ কাপ দুধ কিংবা ৩/৪ কাপ দই থেকেই চাহিদার এক তৃতীয়াংশ পূরণ করা সম্ভব।

• আয়রণ:

যেসব নারীদের শরীরে মিনারেলের অভাব রয়েছে এবং শরীরে আয়রনের মাত্রা কম অর্থাৎ যারা এনিমিক, তারা বুদ্ধি-বিবেচনামূলক প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় বেশি নেয় এবং সহজে দুর্বল হয়ে পড়ে। মাসিকের কারণে নারীদের দৈনিক আয়রনের চাহিদা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি (১৮ মিলিগ্রাম)। তাই চাহিদা পূরণে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়  আয়রণ সমৃদ্ধ খাবার, যেমন- চর্বিহীন গরুর মাংস, সয়াবিন, মিষ্টি কুমড়ার বীচি, চামড়া ছাড়া মুরগির মাংস, শুকনো ফলমূল, গাঢ় সবুজ রঙের শাক-সবজি, বিভিন্ন রকম ডাল ও শস্য জাতীয় খাবার খেতে পারেন।

• ভিটামিন ডি:

এই ভিটামিন শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ব্রেস্ট ও  কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। অনেকেই হয়তো জানেন, সূর্যের আলো ভিটামিন ডি এর উৎস। সরাসরি উৎস না হলেও এটি শরীরে ভিটামিন ডি কে সক্রিয় হতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন একটু রোদ পোহানোর অভ্যাস করুন। এছাড়াও এর অন্যান্য উৎস হল- দুধ জাতীয় খাবার, ডিম, বাদাম ইত্যাদি।

• ফলেট বা ফলিক এসিড:

খুবই গুরুত্বপূর্ণ এটি, বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য। এর অভাবে নবজাতক মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকে, জন্ম হলেও স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে জন্ম নিতে পারে। ভয়ের বিষয় হল গর্ভ ধারণ করার ২৬ দিনের ভেতরই যা ঘটার ঘটে যায়, অর্থাৎ গর্ভে কিছু আছে তা টের পাওয়ার আগেই! বুঝতেই পারছেন একজন প্রজননক্ষম নারীর ক্ষেত্রে ফলেটের গুরুত্ব কি অপরিসীম। তবে আশার কথা এই যে প্রত্যহ সবুজ শাকসবজি, ডাল খেলেই ফলেটের দৈনিক চাহিদা (৪০০ মাইক্রোগ্রাম) পূরণ করা যায়।

• বি-১২:

ফলেটের মতোই ভিটামিন বি-১২ সন্তানের সুস্থ স্নায়ুতন্ত্রের গঠনের জন্য জরুরি। পার্থক্য হল, এটি মূলত প্রাণিজ প্রোটিনেই বেশি বিদ্যমান। অর্থাৎ, আপনি নিরামিষাশী হলে, চিন্তার একটু কারণ রয়েছে।

• কোলিন:

এটাও ফলেট এর মত কারণেই এটি খুব জরুরি, বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য। তবে প্রতিদিন একটি ডিম খেলেই যথেষ্ট, আর ভয় নেই। আরো উৎস হল- দুধ, বাদাম ইত্যাদি।

• পটাসিয়াম:

শরীরের মাংসপেশি ও  হৃদযন্ত্র কার্যকর  রাখার জন্য প্রয়োজন সঠিক মাত্রার পটাশিয়াম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ২০-২৯ বছর বয়সী অধিকাংশ নারীই দৈনিক চাহিদার চাইতে কম পরিমাণে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খান। দুই কাপ পরিমাণ ফলমূল এবং আড়াই কাপ পরিমাণ শাক বা সবজি খেলে শরীরে প্রতিদিনের পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

• ‎ফাইটোকেমিক্যাল:

অনেকের কাছে এটি নতুন শব্দ হয়তো। এটি প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সম্পন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান, যা আমাদের শরীরের বিভিন্ন রকমের উপকার করে। যেমন, এটি বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আনে, হৃদরোগের ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফাইটোকেমিক্যাল সম্পন্ন খাবার হলো- চা, কফি, মশলা এবং নানা ধরনের শাক সবজি।

• ফিটনেস:

শারীরিক ভাবে ফিট থাকা সব বয়সের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এই বয়সে। মা হতে চাইলে, একটি সুস্থ সন্তান চাইলে, রোগ বিহীন বাকি জীবন চাইলে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে নিজের শরীরকে ঝরঝরা রাখার কোন বিকল্প নেই। যতই ভালো খাবার খান না কেন,  শরীর ফিট না থাকলে তা কাজে লাগবে না। তাই প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ মিনিট হাঁটুন কিংবা ১০ মিনিট ব্যায়াম করুন। একই সাথে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমও কিন্তু জরুরি।

একটা কথা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে, এ বয়সে করা অনিয়ম গুলোই ভবিষ্যতে ভীষণ বিপদ ডেকে আনতে পারে। আগে আমরা অনেক বয়স্কদের যেসব অসুখে ভুগতে দেখতাম, তা আজকাল মধ্যবয়সীদের মাঝেও দেখা যায়। আজ আপনি সময় থাকতে সচেতন না হলে কাল হাজার কেঁদেও কূল পাবেন না। তাই সংসার,ক্যারিয়ার ইত্যাদি গড়ার পাশাপাশি শরীরকেও সুঠাম রূপে গড়ে তুলুন। এ সবগুলো মিলিয়েই তো আপনার জীবন, তাই না?

(ফারিহা মুশাররাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ নিউট্রিশন এন্ড ফুড সাইন্সের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী)

ছবিঃ আইসিডিডিআর,বি, ইন্টারনেট

লেখাটি কি আপনার উপকারে এসেছে?
হ্যানা