Photo by Bonnie Kittle on Unsplash

২০১৬র ডিসেম্বরে  আমার ছেলের জন্ম হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্। আমার মেয়ের বয়স তখন ১৭ মাস। আমি সেই সময় হাজব্যান্ডের পিএইচডির সুবাদে নিউযিল্যান্ডে ছিলাম। আমার মেয়ের জন্মও হয়েছে সেখানে। আমার প্রথম লেবার অনেক লম্বা আর কঠিন ছিল। আমাকে ইন্ডাকশন দেয়া হয়েছিল। ইন্ডিউসড পেইনে ন্যাচারালি উঠা পেইনের চেয়ে বেশি ব্যথা হয়। আমার মেয়ে ‘ফেস প্রেজেন্টেশন’ ছিল মানে ওর মুখ আগে এসেছিল। তাই শেষ পর্যন্ত ফোরসেপ ডেলিভারি করাতে হয়। তাই প্রথমবার আমার পুরোপুরি নরমালের অভিজ্ঞতা হয়নি। আমার মিডওয়াইফ বেশ কিছু জিনিস পড়তে দিয়েছিল প্রেগন্যান্সীর সময়। বাংলাদেশ থেকে আসা আমি সেগুলোকেই অনেক কিছু মনে করেছিলাম এবং এর বাইরে আর বেশি কিছু জানার প্রয়োজনীয়তা বুঝিনি।

এবার এক কিউই মুসলিম বোন উনার এন্টিনাটাল ক্লাসের নোট, সিডি, একটা প্রেগন্যান্সীর বই আর ‘Tummy Talk’ নামে নিউযিল্যান্ড ভিত্তিক একটা প্রেগন্যান্সী ম্যাগাজিন পড়তে দিয়েছিলেন। মাশাল্লাহ এবার আমার প্রিপারেশন বেশ ভালো ছিল। পরে বুঝেছি, মিডওয়াইফদের কাজ আসলে সবকিছু জানান না। অনেক কিছু ক্লাস করে বা সেলফ স্টাডি করে নিজেকেই জানতে হয়। ওই ম্যাগাজিনে অনেকগুলো ন্যচারাল বার্থ স্টোরি পড়েছিলাম। পড়ে এত ভালো লেগেছিল যে তখনই ঠিক করেছিলাম আমার এবারের অভিজ্ঞতা যদি ভালো হয় তাহলে আমিও লিখব ইনশাল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ্ এবারের অভিজ্ঞতা যা হয়েছে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারত না! আমি মনে করি নরমাল ডেলিভারি নিয়ে ভয়ানক গল্প না শুনিয়ে পজিটিভ অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করা উচিত। মায়ের মনের ওপর এর বিশাল পজিটিভ প্রভাব পড়ে। অনেকগুলো পয়েন্ট লিখতে গিয়ে আমার লেখাটা বেশ বড় হয়ে গেছে। আশা করি লেখাটা আপনাদের উপকারে আসবে ইনশাল্লাহ।

আমার দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সীর দশম মাসে আমি হাঁটতে বের হওয়ার ব্যপারে খুব সচেতন ছিলাম। মেয়েকে স্ট্রলারে বসিয়ে মাঝে মাঝে বের হতাম। ৩৯ সপ্তাহ থেকে প্রায় প্রতিদিনই বের হতাম। শেষের দিকে স্ট্রলার ঠেলা কষ্টকর হয়ে যেত তাই মেয়ের বাবা তাকে রাখত। আমার প্রথম সন্তান দশদিন ওভারডিউ ছিল। আমি এবার আর ওভারডিউ হতে চাচ্ছিলাম না। আমার মিডওয়াইফ  হাঁটতে বের হতে বলছিল। ওর নিজের দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার দিন ও লন মোয়িং করতে বের হয়েছিল আর সেদিনই ওর মেয়ে হয়। এই কথা শুনেও ইন্সপায়ার্ড হয়েছিলাম।

৩৯ সপ্তাহে আমার বাওয়েল মোশন দুইবার করে হতো। এটা আমার ফিজিওলজিতে বেশ অস্বাভাবিক। আমার মিডওয়াইফ বলেছিল অনেকসময় শরীর লেবারের জন্য রেডী হলে এমন হতে পারে যে অপ্রয়োজনীয় জিনিস শরীর নিজ থেকে বের করে দেয়। আবার এটা শরীর রেডী হচ্ছে তার লক্ষণ নাও হতে পারে। তবে আমার মনে হচ্ছিল যে আমার শরীর বোধহয় লেবারের জন্য রেডী হচ্ছে। ৪০ সপ্তাহের প্রথম দিন মসজিদের সানডে স্কুলের টিচারদের সাথে একটা ডিনার ছিল। আমার এই ডিনারে যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল। তখন আবার মনে হচ্ছিল আমার শরীর লেবারের জন্য স্লো কাজ করছে। লেবারের সাথে আসলে সাইকোলজিক্যাল কানেকশন থাকে। আমি চাচ্ছিলাম না ওই ডিনারের আগে আমার বাবু হোক।

যাই হোক, ওই ডিনারের পর থেকে আমি দু’আ করতে শুরু করলাম যেন বাবু যদি ম্যাচিউরড হয়ে যায় তাহলে যেন তার জন্ম হয়ে যায়, কারণ আমাকে যেন আবার ওভারডিউ হতে না হয়। আবার আমার মনে হতে লাগল যে আমার শরীর লেবারের জন্য রেডী হচ্ছে, বাওয়েল মোশন দুইবার করে হচ্ছে।

৪০ সপ্তাহ পঞ্চম দিনে মেয়েকে নিয়ে দুপুরে শুয়েছি। মনে হতে লাগল হালকা পিরিয়ডের মতো ব্যথা হচ্ছে। তবে বেশ সহনীয়। আমি আশা করলাম তবে এক্সাইটেড হলাম না। যা পড়েছিলাম তা মনে করলাম। লেবারের শুরুতে যখন ব্যথা কম থাকে তখন নরমাল এক্টিভিটি যা করছিলাম তা করে যেতে হবে। প্রথম দিকে রেস্ট নিয়ে নেয়া ভালো। তাই আমিও মেয়ের সাথে শুয়ে একটু ঘুমিয়ে নিলাম। ঘুম থেকে ওঠার পরও অনিয়মিতভাবে ব্যথা হতে লাগল, আমিও নরমাল এক্টিভিটি বজায় রাখলাম। শুধু ব্যথার সময় পেলভিক রকিং আর ডীপ  অ্যাবডোমিনাল ব্রিদিং করতাম। আগে দেখা এই ভিডিওটা খুব উপকারে এসেছিলঃ

http://www.amanibirth.com/apps/blog/show/43696007-video-about-staying-active-in-labor ।  AMANI Birth – এর CDতে শোনা ব্রিদিং টেকনিক আর পেলভিক রকিং দুইটা কাজ মনে হচ্ছিল যেন আমার ব্যথা অনেক কমিয়ে দিচ্ছিল। এই দুইটা কাজ আমি পুরো লেবার পেইনের সময় অ্যাপ্লাই করেছিলাম।

রাত ৮টায় আমার হাজব্যান্ড বাসায় আসলে তাকে জানালাম। রাতের খাওয়া আর ঘরের অন্যান্য কাজ করতে করতে আরও অনেকটা সময় চলে গেল। রাতের খাওয়াটা ঠিকমতই খেলাম কারণ পড়েছিলাম যে শেষের দিকে এনার্জি লাগবে কিন্তু তেমন খাওয়া যাবে না তাই আগেই খেতে হবে ভালো করে। এর মাঝে অনিয়মিতভাবে ব্যথা হতে লাগল। আমার মিডওয়াইফকে জানালাম। মিডওয়াইফরা প্রথমে তেমন এক্সাইটেড হয় না এসব দেশে। ও আমাকে বলল পরবর্তী এক ঘন্টায় কতটা ঘনঘন ব্যথা হচ্ছে খেয়াল করে ওকে জানাতে। আমি অল্প কিছু জিনিস আগে হসপিটালে নেয়ার ব্যগে ঢুকিয়েছিলাম। এখন আর সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি আগে থেকে লিখে রাখা লিস্ট দেখে ব্যাগ গুছাতে শুরু করলাম। সেই সাথে সালাতের বিষয়টা জেনে নেয়া দরকার মনে করলাম। আমার প্রথমবারের ব্যপারটা অন্যরকম ছিল। নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করার মতো অবস্থা ছিল না তাই ওই কিউই সিস্টারকে জিজ্ঞেস করলাম যার নিজের তিনটা বাচ্চা আছে। উনি বললেন লেবারের কোন এক পর্যায়ে ব্লাডি শো দেখা যাবে তবে কখন সেটা হবে তা বলা মুশকিল। যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে সালাহ পড়তে হবে। সেই সাথে আরও বললেন ওই সময় থেকে আমার ছেলেমেয়ের জন্য দু’আ করতে যেন তারা ভালো বন্ধু হয়।

এক ঘন্টা পর আমার মিডওয়াইফকে জানালাম যে ব্যথা এখনও ৫-১০মিনিট গ্যাপে হচ্ছে। যখন হচ্ছে তখন পরপর অনেকবার হচ্ছে আবার মাঝে ২০মিনিটের মতো গ্যাপও ছিল। রাত তখন পৌনে এগারটা বাজে। ও বলল, হয়ত এটা শুধু প্রাকটিস কন্ট্রাকশন, ঘুমাতে চেষ্টা করতে বলল তাতে হয়ত ব্যথা কমতে পারে। যখন ব্যথা প্রতি ৩মিনিট পর হবে অথবা অনেক বেশি হবে তখন ওকে জানাতে বলল। ও এখন ঘুমাতে যাবে। এই মেসেজ আমাদের উৎসাহে একটু ভাটা ফেলে দিল।
তখন ভাবলাম, আচ্ছা ঘুমাতে চেষ্টা করে দেখি। এখানে তখন ইশা রাত সাড়ে এগারটায়। আমার হাজব্যান্ড মসজিদে গেল আর আমি মেয়েকে দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্য ওর সাথে শুলাম। সেই সময় আমার তিনটা কন্ট্রাকশন হয়েছিল। যেহেতু আমি লেবারের সাথে কোপ করার মতো পজিশনে ছিলাম না তাই ওই কন্ট্রাকশনগুলো আমার বেশ পেইনফুল লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন কী করব বুঝে পাচ্ছিনা! যাই হোক, এক সময় মেয়ে ঘুমাল এবং আমি বুঝলাম যে ঘুমাতে চেষ্টা করেও আমার পেইন যাচ্ছে না। মানে আশার কথা। ইশার সালাত পড়লাম। ধীরে ধীরে কিছু কন্ট্রাকশন বেশি পেইনফুল হতে লাগল।  আমার আগের রাতে আর ওইদিন দুপুরে ভালো ঘুম হয়নি তাই পরে টায়ার্ড হয়ে যাই কিনা এই নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আমি পড়েছিলাম যে লেবারের শুরুর দিকেই রেস্ট নিয়ে নিতে হয় নাহলে পুশিং স্টেজে কষ্ট হয়। AMANI Birth বইতে লেবারের সময় এক্টিভ্লি শোয়ার একটা পজিশনের কথা বলা ছিল। সেভাবে শুয়ে রেস্ট নিতে এবং কন্ট্রাকশনের সময় কোপ করতে পারি কিনা দেখতে চাইলাম। কিন্তু আমি কোনভাবেই শুয়ে আরাম পাচ্ছিলাম না। আসলে সব লেবার পজিশনে সবাই কমফোর্ট্যাবল হয় না। তাই বিভিন্ন পজিশন ট্রাই করে দেখতে হয় কোনটায় আরাম পাওয়া যায়।

আমার হালকা ঠাণ্ডা লাগছিল। মনে পড়ল যে পড়েছিলাম লেবারের সময় অনেকের শীত শীত লাগে। জ্যাকেট পরে নিলাম। আমার হাজব্যান্ড হিটারও ছেড়ে দিল। আবার মিডওয়াইফকে মেসেজ দিলাম। ও এবার নিশ্চিত করল যে আমি early  লেবারে আছি। আমি হাজব্যান্ডকে মেয়ের সাথে ঘুমাতে দিয়ে নিজে টেবিলের ওপর বালিশে মাথা রেখে চেয়ারে বসে রইলাম। উদ্দেশ্য কন্ট্রাকশনের মাঝে রেস্ট নেয়া। আমার মোটামুটি ৫-১০মিনিট পরপর পেইন হচ্ছিল। পেইনের সময় আমি পেলভিক রকিং আর ডীপ এবডোমিনাল ব্রিদিং করছিলাম। আমি দেখলাম যে দুইটা কন্ট্রাকশনের মাঝে যেটুকু সময় পাই সে সময়টায় অল্প যা ঘুম হয় তাতে বেশ ফ্রেশ লাগে। কয়েকটা খেজুর খেলাম। লেবারের সময় খেজুর ডিহাইড্রেশন দূর করে। কুরআনে আল্লাহ্ মারইয়াম(আলাইহাস সালামকে) লেবারের সময় খেজুর খেতে বলেছিলেন।
মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি করছিলাম এই রুম সেই রুম। খেয়াল করলাম যে আমি হাঁটলে পেইন ঘন ঘন হচ্ছে। গভীর রাত, তার ওপর আগের রাতেও ভালো ঘুমাতে পারিনি তাই রাতের শেষের দিকে আমি বেশি সময় বসেই রইলাম যেন রেস্ট হয় কিছুটা আর পরবর্তীতে পুশিং স্টেজে এনার্জি পাই। আমার প্রথম ডেলিভারির সময় এপিসিওটমি ছিল। আবার ডেলিভারির সময় পুশিং স্টেজে সেই জায়গার কাছাকাছি টিয়ার হওয়ার চান্স আছে। AMANI Birth বইতে টিয়ার রোধ করতে পেরিনিয়াম এরিয়ায় সাবান ব্যবহার না করতে আর লোশন দিতে বলেছে। আমি ওই রাতে একসময় সেই এরিয়ায় অলিভ অয়েল দিলাম। একসময় ফযর হোল। সালাহ পড়লাম। ভোর সাড়ে ছয়টায় মিডওয়াইফকে টেক্সট করলাম যে বেশ তীব্র ব্যথা হচ্ছে এবং হাঁটলে ৩-৪মিনিট পরপর পেইন আসছে। ও আধা ঘন্টা পর বলল তাই যদি হয় তাহলে আমার হসপিটালে আসা উচিত। সেকেন্ড বাচ্চা অনেক সময় তাড়াতাড়ি বের হয়। আমার হাজব্যান্ডের মনে হচ্ছিল আমরা তাড়াতাড়ি যাচ্ছি, মেয়ে ঘুম থেকে উঠলে তারপর ৯টার দিকে গেলেও হবে। কিন্তু আমি ভালোই বুঝতে পারছিলাম যে আমার লেবার বেশ এগিয়ে গেছে। সকালে খেতে চেষ্টা করলাম কিন্তু মনে হোল বমি করে ফেলব। তখন বুঝলাম কেন বলা হয় লেবারের শুরুর দিকেই ভালো করে খেয়ে নিতে। শুধু কিছু দই খেলাম। এর মাঝেই আমার মেয়ে উঠে গিয়েছিল। এসবই আল্লাহর রহমত। আমি আসলে বেশ চিন্তিত ছিলাম আমার লেবারের সময় মেয়ের দেখাশোনা নিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ্ ও একদম ঠিক সময়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা বের হওয়ার আগে আমাদের প্রতিবেশীর কাছে ওকে রেখে গেলাম।

আমার হাজব্যান্ডের গাড়ি স্টার্ট দিলে অটো কুরআন প্লে হতে থাকে। ওই সময় কুরআন শুনে হঠাত আমার এত্ত ভালো লাগল! হসপিটালের কাছে গাড়ি পার্ক করে কিছুটা হেঁটে যেতে হোল। সাবধানে হাঁটছিলাম যেহেতু হাঁটলেই পেইন ঘন ঘন হচ্ছিল। লিফট দিয়ে উপরে উঠে কাউন্টারে যেতে রিসেপশনে বলল করিডোর ধরে আগাতে। একটু আগাতেই দেখলাম একটা লেবার রুমে আমার মিডওয়াইফ দাঁড়িয়ে আছে। আমি রুমে ঢোকার পর বাড়তি লাইট নেভাতে বললাম। লেবার অগ্রসর হওয়ার জন্য মৃদু আলো সহায়ক। যদিও তখন সকাল কিন্তু আমি আরও উজ্জল আলো চাচ্ছিলাম না। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ২০মিনিট সিটিজি করতে হয় বাচ্চার হার্টবিট দেখতে। আমার সবকিছু স্বাভাবিক ছিল তাই ও ১০মিনিট করেই বন্ধ করল। প্রয়োজন ছাড়া টেকনোলজির ব্যবহার মিনিমাম রাখার পক্ষে ছিলাম আমি। আমার চয়েস নিয়ে ওর সাথে আগেই কথা বলে রেখেছিলাম। ও আরও আমার বিপি, টেম্পারেচার নিল। এসব হসপিটাল ফর্মালিটি করার সময় আমার যে কন্ট্রাকশন হচ্ছিল সেটা দেখে ও বলল যে আমার মাঝে ভেতর থেকে বাবুকে বের করে দেয়ার একটা হালকা ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। ও একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল ভ্যাজিনাল এক্সামিনেশন করবে কিনা। আমি বলেছিলাম এর কী দরকার আছে? ও বলল, না তবে আমি যদি জানতে চাই সারভিক্স কতটুকু ডাইলেট হয়েছে তাহলে ও করতে পারে। আমি করতে চাইনি। ভ্যাজিনাল এক্সামিনেশনে ইনফেকশনের সুযোগ থাকে। প্রয়োজন না থাকলে আমি এর বিপক্ষে। ও আগে থেকেই রুমে দুই রকমের বার্থ স্টুল এনে রেখেছিল পুশিং স্টেজে স্কোয়াটিং করার জন্য। আমি দুইটাতেই বসে দেখলাম কিন্তু আরাম পেলাম না। আবার আমার আগের পজিশনে ফেরত গেলাম। খাটের ওপর ঝুঁকে রইলাম। একসময় ব্লাডি শো বের হোল। ওয়াটার ব্রেক করল। এবং …

আস্তে আস্তে আমার লেবারের সেকেন্ড স্টেজ মানে পুশিং স্টেজ শুরু হোল। যেহেতু আমি ফ্লোরের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম মিডওয়াইফ বেডের একটা ফোম উঠিয়ে নিচে রাখল আর আমি সেটার ওপর দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে আরও হার্ড কন্ট্রাকশন হতে লাগল। আমি বেডের ওপর মাথা ফেলে রেখেছিলাম। যখন বুঝলাম বাবু বের হওয়ার সময় হয়ে আসছে আমি “বিসমিল্লাহ” বললাম। কারণ বের করার কাজটা আমাকেই করতে হবে।

আমি জীবনেও ভাবিনি আমার গলা দিয়ে এমন বিকট চিৎকার বের হবে! আমার মিডওয়াইফ এই সময় বলল আমার এনার্জি চিৎকারের মাধ্যমে বের না করে নিচের দিকে আরও জোরে পুশ করার মাধ্যমে বের করতে। মিডওয়াইফদের কাজ মূলত এটাই — অ্যাসিস্ট করা। বাবু বের করার আসল কাজ মাকেই করতে হয়। ইনফ্যাক্ট আমি হসপিটালে যাওয়ার পর ও আমাকে বলেছিল তুমি তোমার মতো করে লেবারের সাথে কোপ করতে থাক, আমি চুপচাপ এখানে আছি। মানে সাপোর্টিং পারসন হিসাবে থাকবে, দরকার হলে হেল্প করবে। যাই হোক, আমি ওর কথা মতো পুশিং এর সময় আরও জোরে প্রেসার দেয়া শুরু করলাম। আমি অটোম্যাটিক্যালি স্কোয়াটিং করছিলাম পুশিং এর সময়।  মনে হচ্ছিল যেন আমার টয়লেট হবে এবং হলে খুব ভালো লাগত। মিডওয়াইফ বলল পুশিং এর অনুভূতিটা এমনই। আমি কম সময় নিয়ে পুশ করছিলাম তাই ও আরও বলল একটু বেশি সময় ধরে পুশ করতে। আমি সেটাই চেষ্টা করলাম। এভাবে বেশ কয়েকবার এবং আলহামদুলিল্লাহ্ আমার বাবু কাশি এবং হালকা কান্না সহ বের হয়ে আসল। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তাই আমার মিডওয়াইফ ওকে ধরে ফেলল।

আমি পেছনে রাখা সোফায় গিয়ে বসলাম। বাবুকে কোলে নিয়ে তখনই দুধ খাওয়াতে চাইলাম। কিন্তু সে ক্ষুধার্ত ছিল না। চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমার গায়ের সাথে বেশ কিছুক্ষণ ওকে মিশিয়ে রাখলাম। একদম শান্ত ছিল মাশাল্লাহ। পালসাটিং বন্ধ হওয়ার পর আমার হাজব্যান্ড নিজেই আম্বিলিক্যাল কর্ড কাটল। আমি তখন লেবারের তৃতীয় স্টেজে মানে প্লাসেন্টা ডেলিভার হবে এখন। তখনও পর্যন্ত কন্ট্রাকশন হয় এবং প্লাসেন্টা বের করার জন্য পুশ করতে হয়। প্লাসেন্টা হচ্ছে হাড়বিহীন নরম একটা জিনিস তাই এটা পুশ করাটা বাচ্চা পুশ করার মতো না।  আমার প্লাসেন্টা বের হতে সময় লেগেছিল। এই সময়ের  কন্ট্রাকশনগুলো কষ্টকর মনে হচ্ছিল। আমার হাজব্যান্ডের কাছে বাবুকে ছিল। ও খাওয়ার মতো ভাব করায় আমার কোলে দিল আবার। বাবু দুধ খেলে কন্ট্রাকশন হয় এবং এটা প্লাসেন্টা বের হতে হেল্প করে। যাই হোক ৪৫ মিনিট পর আমার প্লাসেন্টা বের হোল। দেখা গেল আমার কর্ড প্লাসেন্টার মাঝখানে না হয়ে পাশে ছিল তাই বের হতে সময় লাগছিল। সুবহানআল্লাহ সবকিছু ঠিক থাকার পরও কোন কিছু অন্যরকম হতে পারে। এক ঘন্টা পার হয়ে গেলে প্লাসেন্টা বের করার জন্য ইঞ্জেকশন দেয়া হয়। আমি সেটা চাচ্ছিলাম না।

প্রেগন্যান্সী নিয়ে আমার এতসব পড়াশুনার ব্যপারে আমার হাজব্যান্ড প্রথমে একটু সন্দিহান ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল দেখে নিজেই বলেছে, “তুমি এবার ভালো রোল প্লে করেছ।” তাই বাচ্চার ব্যপারে আপনি যেটা বেস্ট মনে করেন সে ব্যপারে কনফিডেন্ট থাকেন ইনশাল্লাহ। প্রথম লেবারের সময় আমার হাজব্যান্ড প্রায় পুরো সময় আমার সাথে ছিল। এবার কতটা থাকতে পারবে এই নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম যেহেতু আমার মেয়ে ছোট। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম ও থাকুক আমার সাথে।  Tummy Talk ম্যাগাজিনের একটা আর্টিকেল পড়ে আশ্বস্ত হয়েছিলাম। লেবারিং মেয়েদের সঠিক পরিবেশ করে দেয়াটাই যথেষ্ট। মানে প্রাইভেসী, আরামদায়ক পরিবেশ যেমন মৃদু আলো, উষ্ণ রুম ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দেয়া এবং একটু পাশে থাকাই যথেষ্ট। লেবারিং মেয়েদের তাদের মতো করে ছেড়ে দিলে তারা নিজেরাই ম্যানেজ করতে পারে। যতক্ষণ ঘরে ছিলাম আমার হাজব্যান্ড এসব করতে চেষ্টা করেছে। আমিও ওকে রাতে ঘুমাতে দিয়ে আমার মতো ম্যানেজ করেছি। আর হাসপাতালে ও আমার পাশে ছিল। আলহামদুলিল্লাহ্ এটাই একটা মেয়ের এই সময় বড্ড দরকার হয়। অমুসলিম ছেলেরা এই ব্যপারে যতটা এগিয়ে মুসলিম ছেলেরা যেন ততটাই পিছিয়ে। অথচ সে পাশে থাকলে তার স্ত্রী আরও ভালো পারফর্ম করতে পারে তাদের সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে। AMANI Birth বইতে পড়েছি এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেও দেখেছি ডেলিভারির সময় হাজব্যান্ড পাশে থাকা ম্যারিটাল লাইফে এবং সন্তানের সাথে বাবার সম্পর্কে খুবই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের হাসপাতালে এর সুবিধা কতটুকু আছে এই নিয়ে প্রশ্ন না তুলে আগে নিজেদের এই ব্যপারে সচেতন হওয়া জরুরী।

এবার আমি যতটা সম্ভব ন্যাচারালভাবে সবকিছু করতে চেষ্টা করেছি। ওই দেশের মিডওয়াইফরা সবসময় যতটা সম্ভব ডায়েট থেকেই আয়রন, ক্যালশিয়াম নিতে বলে। থার্ড ট্রাইমেস্টারে দরকার হলে আয়রন দেয়। বিদেশে একার সংসার তাই স্বাভাবিক এক্টিভিটি চালু ছিল। সেই সাথে থার্ড ট্রাইমেস্টার থেকে পেলভিক রকিং, হিপ রোটেশন, স্কোয়াটিং করতাম। স্কোয়াটিং একটা আছে শূণ্যে বসার মতো আরেকটা আছে লো কমোডে বসার মতো যাকে ডীপ স্কোয়াটিং বলে। আমি দুটোই করতাম। টেইলর সিটিং, মানে দুই পায়ের গোড়ালি একসাথে লাগিয়ে ফ্লোরে বসা, এটা করতাম। কুশন বা বালিশের কিনারে বসে পায়ের আঙ্গুল উপরের দিকে রেখে দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বসা, এটা করতাম। এগুলো দিনে ৩-৫ বার করে প্রতিবার ১০-২০ সেকেন্ড ধরে করতাম। আস্তে আস্তে বাড়িয়েছিলাম। পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ করতাম অনেক বার, ডেলিভারির পরও করেছি। এটা আসলে একটা লাইফ লং এক্সারসাইজ। এটা করলে প্রেগন্যান্সীর সময় পেলভিক বোনের ব্যথা কম হয়, বাচ্চার ফেস প্রেজেন্টেশন রোধ হয়। আর প্রেগন্যান্সীর পর অনেকের ইউরিন লিক হওয়া, টয়লেট করতে কষ্ট হওয়ার সমস্যা হয়। এই এক্সারসাইজ করলে এসব দূর হয়। এটা আমি করেছিলাম দিনে ৫০/৭০/১০০ বারেরও বেশি করে। ধীরে ধীরে বাড়িয়েছিলাম। তবে শেষের দিকে করতে কষ্ট হতো তাই ১০/২০/৩০ বার করে করতাম। যেকোন  প্রেগন্যান্সী এক্সারসাইজ করার আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলে করা উচিত। আমার  প্রথম দিকে গ্যাসের সমস্যা হতো আর শেষের দিকে বুক জ্বালা করত। আমার মিডওয়াইফ বলেছিল  গুয়ামুড়ি (fennel) গরম পানিতে ভিজিয়ে খেলে গ্যাস বের না হলে  সেটা বের হতে সাহায্য করে, তবে আমি বুক জ্বলার জন্যও এটা খেয়ে উপকার পেয়েছি। উঁচু বালিশে শুলে বুক জ্বলার জন্য আরাম হয়।   আমার একটা টিয়ার হয়েছিল তবে স্টিচ লাগেনি। আমাকে বলেছিল ভালো খাবার খেতে ও রেস্ট নিতে। হালকা গরম পানিতে কিছুটা লবন মিশিয়ে জায়গাটা ধুলে সেরে উঠতে সাহায্য করে। টিয়ারের ব্যথা এপিসিওটমির চেয়ে কম এবং তাড়াতাড়ি ভালো হয়।

AMANI Birth বইতে আছে একজন মানুষ পৃথিবীতে কিভাবে আসল তার ব্যক্তিত্বের ওপর এর একটা প্রভাব থাকে। তার আসাটা যদি স্মুথ হয় তাহলে নতুন পরিবেশ সম্পর্কে সে আশ্বস্ত হয় এবং শান্ত থাকে। একদম নবজাতক অবস্থায় এবং পরবর্তীতেও আমার মেয়ের তুলনায় ছেলেকে বেশি শান্ত মনে হয় মাশাল্লাহ। আল্লাহ্ ভালো জানেন এর আসল কারণ তবে আমার মেয়ে তো পেটে থাকতেই দুই চোখের উপর ব্যথা পেয়েছিল কয়েকবার ভ্যাজিনাল এক্সামিনেশনের কারণে!

নিজের এবং বাচ্চার জন্য যা বেস্ট তার জন্য চেষ্টা করা আমাদের হাতে আছে। আর সেটা বাস্তবে ঘটান আছে আল্লাহর হাতে। তাই দু’আর কোন বিকল্প নেই।  দু’আ করতাম সহজ প্রেগন্যান্সী এবং ডেলিভারির জন্য এবং যা পড়েছি তা যেন প্রয়োগ করতে পারি তার জন্য। আল্লাহ্ সহজ করে দিয়েছেন অনেক। তারপরও সবকিছুই উনার হাতে। আমার প্লাসেন্টা ডেলিভারি খুব সহজভাবে হয়নি। আল্লাহর উপর তাওয়াককুল থাকাটা খুব জরুরী। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকলে শেষ পর্যন্ত রেজাল্ট যাই হোক না কেন মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশন থাকে। আমার মিডওয়াইফকে পরে একসময় বলছিলাম যে আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি ভ্যাজিনাল এক্সামিনেশন করি! ও বলেছিল, সবকিছু ঠিক আছে কিনা এটা লেবার অগ্রসর হওয়ার ধরণ দেখলে বোঝা যায়। আমার কেসটা ওর জন্যও সহজ ছিল।

আমি যেসব বই ইত্যাদি পড়ে উপকার পেয়েছিলাম সেসবের লিংক নিচে দিচ্ছি।

  • AMANI Birth book and CD: http://www.amanibirth.com/apps/webstore/
    (বাংলাদেশ থেকে একজন আপু এই ওয়েবসাইট থেকে বইটা অর্ডার করে পেয়েছেনঃ https://backpackbang.com/ )
  • Preparing for birth: Mothers and Fathers both book: https://birthinternational.com/product-category/books/andrea-robertson-books/
  • Tummy Talk magazine: http://www.h2oh.co.nz/index.php?route=product/product&product_id=49
  • About Delayed cord clamping: https://www.nurturingheartsbirthservices.com/blog/?p=1542
  • About skin-to-skin contact: http://www.bellybelly.com.au/birth/7-benefits-undisturbed-first-hour-after-birth/